“মাহে রামাযানের পরে কোন পথে?”

আল্লাহার তা‘আলার বাণী:
فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَمَن تَابَ مَعَكَ وَلاَ تَطْغَوْاْ إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ – وَلاَ تَرْكَنُواْ إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُواْ فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ اللّهِ مِنْ أَوْلِيَاء ثُمَّ لاَ تُنصَرُونَ – وَأَقِمِ الصَّلاَةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِّنَ اللَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّـيِّئَاتِ ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ – وَاصْبِرْ فَإِنَّ اللّهَ لاَ يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ.

সরল অনুবাদ:
“অতএব তুমি এবং তোমার সাথে যারা তাওবা করেছে সবাই (দীনের উপর) সুদৃঢ় হয়ে থাক আল্লাহ যেভাবে তোমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আর সীমালঙ্ঘন করনা। তোমরা যা কিছু কর তিনি তা ভাল ভাবেই দেখেন। তোমরা পাপাচার যালিমদের প্রতি ঝুঁকে পড়না, তাহলে আগুন তোমাদের স্পর্শ করবে, আর তখন আল্লাহ ছাড়া কেউ তোমাদের অভিভাবক থাকবেনা, এবং তোমাদেরকে সাহায্যও করা হবেনা। আর দিনের দুই প্রান্তে এবং রাতের কিছু অংশে সালাত কায়েম কর, নিশ্চয়ই পুণ্য কাজ পাপকে দূর করে দেয়, যারা (আল্লাহকে) স্মরণ করে এটা তাদের জন্য উপদেশস্বরূপ। ধৈর্য ধারণ কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না। সূরা হুদ: ১১২-১১৫
আয়াতসমূহ অবতরণের প্রেক্ষাপট:
আলোচ্য আয়াত সমূহ সূরা হুদ এর অন্তর্গত, সূরা হুদ মাক্কী সূরা। অতএব আলোচ্য আয়াতসমূহ ইসলামের প্রাথমিক যুগে সালাতের সময় এবং ইসলামের উপর অটল থেকে প্রতিকূল অবস্থায় ধৈর্য ধারনের নির্দেশ নিয়ে অবতীর্ণ হয়।

আয়াতসমূহের আলোচ্য বিষয়:
আলোচ্য আয়াতসমূহে সর্বমোট পাঁচটি বিষয়ে আলোচনা স্থান পেয়েছে:
(১) সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ পালনে অটল থাকা।
(২) সীমালঙ্ঘন, পাপাচার, যুলুম ও নির্যাতনে লিপ্ত না হওয়া।
(৩) যথা সময়ে সালাত কায়েম করা।
(৪) সৎ কর্মের মাধ্যমে পাপ কর্ম মোচন হয়ে যায়।
(৫) সত্যের উপর ধৈর্য ধারণ করা এবং ধৈর্যের প্রতিদান।

আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা:
فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَمَن تَابَ مَعَكَ وَلاَ تَطْغَوْاْ إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
১১২। এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা রাসূল (সা) এবং মুমিনদের আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী পূর্ণ ইসলামের উপর সর্বদায় অটল থাকার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন। কারণ ইসলাম কোন নির্দিষ্ট মাস বা বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জীবনের সর্ব মুহূর্তে ও সর্বেক্ষেত্রেই ইসলাম মেনে চলতে হবে। সাথে সাথেই আল্লাহ আরেক নির্দেশ জারি করছেন যে, তোমরা সীমালঙ্ঘন করনা, অর্থাৎ শরীয়ত মানার ক্ষেত্রে তা ইসলামী সীমারেখার মধ্যে থেকে মেনে চলতে হবে, মনগড়া বা খেয়াল খুশী অনুযায়ী মানলে চলবে না।
وَلاَ تَرْكَنُواْ إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُواْ فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ اللّهِ مِنْ أَوْلِيَاء ثُمَّ لاَ تُنصَرُونَ
১১৩। আল্লাহ তা‘আলা পূর্বের আয়াতে ইসলামের উপর অটল থাকার নির্দেশ দিয়ে এ আয়াতে ইসলাম হতে দূরে সরে পড়ার পথকে বন্ধ করে দেন এবং তার পরিণতিও বর্ণনা করে দেন। পাপাচার ও অত্যাচারীদের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া এবং তাদের সংস্পর্শে যাওয়া তাদের মত অসৎকর্মে লিপ্ত হওয়ার শামিল, তাই আল্লাহ ইহা নিষিদ্ধ করেছেন, আর তাদের সাথে সম্পর্ক রাখার মাধ্যমে অসৎ কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়লে অবশ্যই আযাব ভোগ করতে হবে এবং আল্লাহ তা‘আলার অভিভাবকত্ব ও সাহায্য সহাযোগিতা হারাতে হবে।
وَأَقِمِ الصَّلاَةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِّنَ اللَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّـيِّئَاتِ ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ
১১৪। এ আয়াতে আল্লাহ তাঁআলা পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মধ্যে চার ওয়াক্তের সময়কাল এর আলোচনা করেছেন। দিনের দুই প্রান্তে অর্থাৎ সকাল ও বিকালে ফজর ও আসর নামায আর রাতের কিছু অংশে অর্থাৎ মাগরিব ও ঈশার নামায। অন্যত্রে (সূরা বানী ইসরাইলে) যোহরের নামাযের সময় উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবেই আল্লাহ তা‘আলা নামাযের সময়ের ইঙ্গিত সূচক আলোচনা করেছেন, আর কুরআনের মূল ভাষ্যকার রাসূল (সা) স্বীয় হাদীসে সবিস্তারে আলোকপাত করেছেন। অতএব ঐ নির্ধারিত সময়ে নাবী (সা) এর পদ্ধতি অনুযায়ী সালাত আদায় করার নামই হলো ইকামাতুস সালাত।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, সৎকর্মসমূহ অসৎকর্ম বা পাপকে দূর করে দেয়। ইহা সাধারণত দুই প্রকার এক. সকল প্রকার অসৎ কর্ম বা পাপকে দূর করে দেয় (অথাৎ ছোট বড় সব পাপ) যেমন ইসলাম গ্রহণ পূর্ববর্তী সকল পাপ মোচনের মত সৎকর্ম। দুই. শুধুমাত্র ছোট পাপকর্মকে দূর করে দেয় যেমন পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায ও অযু ইত্যাদি।
وَاصْبِرْ فَإِنَّ اللّهَ لاَ يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ
১১৫। এ আয়াতে আল্লাহ সবর বা ধৈর্য ধারণের কথা বলেন। মূলতঃ রামাযানের অন্যতম শিক্ষা ও ফসল হলো ধৈয্য, এজন্যই বলা হয় রোযা হলো ধৈর্যের অর্ধেক। ধৈর্য সাধারণত তিন প্রকার। (১) আল্লাহর আনুগত্যে অটল থেকে ধৈর্য ধারণ, (২) আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ। (৩) ভাগ্যের মন্দ ও ব্যথাদায়ক বিষয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহর উপর আস্থা রেখে ধৈর্য ধারণ।
পবিত্র রামাযান মাসে যেমন আল্লাহর আনুগত্যে রত থেকে এবং তার অবাধ্যতা হতে বিরত থেকে ধৈর্য ধারণ করেছি ঠিক তেমনি বছরের বাকী মাসগুলিতেও প্রতিটি মুসলিম ব্যক্তির ধৈর্য ধারণ করা কর্তব্য। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন

মাহে রামাযানের পরে মুসলিম ব্যক্তির অবস্থান:
দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, আমরা শুধু রামাযান মাস আসলেই আল্লাহকে চিনি, আর রামাযান চলে গেলে আল্লাহকে ভুলে যাই। রামাযান আসলে নামায পড়ি, রামাযান চলে গেল নামায ছেড়ে দিই। রামাযান আসলে অন্যায় অশ্লীল হতে বিরত থাকি, রামাযান চলে গেলে অন্যায় অশ্লীল অপকর্মে লিপ্ত হয়ে যাই। রামাযান আসলে কুরআন হাতে নিই, রামাযান চলে গেলে কুরআনের কথা ভুলে যাই। এরূপ কী কোন মুসলমানের জন্য শোভা পায়? না, না, কখনও না! মুসলিম সর্বদায় মুসলিম হিসাবে থাকবে। মুসলিম মুমিন ব্যক্তি একসময় আল্লাহর আনুগত্যশীল হবে, আরেক সময় অবাধ্য হবে এরূপ কখনও হতে পারে না বরং এ অবস্থা হলো মুনাফিক কপটের, যে একবার আল্লাহর মান্য হবে আবার পরনেই অমান্য হবে। আল্লাহর নির্দেশ হলো তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের মুহূর্ত হতে জীবনের শেষ নিঃশ্বাষ ত্যাগ পর্যন্ত তাঁর আনুগত্যে রত থাকবে। তিনি বলেন ((واعبد ربك حتى يأتيك اليقين “নিশ্চিত মৃত্যু আসা পর্যন্ত তোমার রবের ইবাদাতে রত থাক।” (সূরা আল হিজর:৯৯) রাসূল (সা) বলেন: فل آمنت بالله ثم استقم “বল আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি অতঃপর সে ঈমানে অটল থাক।” (সহীহ মুসলিম)
অতএব মুসলিম ব্যক্তি এক ইবাদাত হতে অবসর হলে ইবাদাত বন্ধ করে দিবে তা নয়, বরং এক ইবাদাত হতে অবসর হলে আরেক ইবাদাতে লিপ্ত হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ – وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَبْ
অতএব তুমি যখনই অবসর হবে তখনই (অন্য ইবাদাতে) লেগে যাও এবং তোমার রবের প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী হও।” (সূরা আলাম নাশরাহ:৭ ও ৮)
সুতরাং রামাযান মাসের রোযা শেষ হলেও ইসলামের রোযা বা সিয়াম নামক ইবাদাত শেষ হয়ে যায় না। রামাযান মাস ছাড়া বছরের বাকী দিনগুলিতে বহু ধরনের সিয়াম বা রোযা পালন করার সুযোগ রয়েছে যা এখানে বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয়। উদাহরণ স্বরূপ রামাযানের পরই শাওয়াল মাসের ছয়টি রোযা। প্রতি মাসে তিনটি করে আইয়ামে বিযের রোযা, আরাফা দিবসের রোযা, আশুরার রোযা, যিলহাজ্জ মাসের প্রথম নয় দিনের রোযা, প্রতি সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার রোযা ইত্যাদি। এ রোযাসমূহ বছরের অন্যান্য দিনগুলিতে আমরা রাখতে পারি।
রামাযানের কিয়াম বা তারাবীহ শেষ হয়ে গেলেও অন্য রাত্রিগুলির কিয়াম বা তাহাজ্জুদ শেষ হয় না, সালাতুয যুহা বা চাস্তের নামায- ইত্যাদি নামাযসমূহ রামাযান মাস চলে গেলেও তা প্রতিটি মাস বা দিনে আদায় করা যায়।
অনুরূপভাবে রামাযানে কুরআন খতম শেষ হয়ে গেলেও কুরআন পাঠ ও গবেষণার সময় শেষ হয়ে যায়নি কারণ তা বছরের প্রতিদিনের কর্মসূচী হওয়া উচিত। একইভাবে দান খয়রাত এবং অন্যায় অশ্লীলতা, সুদ, ঘুষ ইত্যাদি বর্জন সবকিছু রামাযানের পরেও প্রতিদিন মুসলিম ব্যক্তির কর্মসূচীর মধ্যে থাকা আবশ্যক।

উপসংহার: এ দারসের উপসংহারে আমরা বলতে পারি যে, মুসলিম ব্যক্তির ইবাদাত কোন সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং তার পূর্ণ জীবনটাই আল্লাহ তা‘আলার ইবাদাতের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত করবে। শুধু রামাযান মাসে সিয়াম, কিয়াম তিলাওয়াত ও দান সাদকায় ব্যস্ত থেকে বাকী এগারটি মাসে যেমন খুশী তেমন চললে তার পরিণতি ভয়াবহ হওয়াই স্বাভাবিক, এমন কি রামাযানের সকল ইবাদাতও বাতিল হয়ে যাওয়াটাও অসম্ভব কিছু নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَلاَ تَكُونُواْ كَالَّتِي نَقَضَتْ غَزْلَهَا مِن بَعْدِ قُوَّةٍ أَنكَاثًا
“তোমরা এমন নারীর মত হয়োনা যে তার সুতাগুলোকে শক্ত করে পাকানোর পর নিজেই তার পাক খুলে টুকরো টুকরো করে দেয়।” (সূরা আন নাহল: ৯২)
সুতরাং প্রকৃত মুসলিম ব্যক্তি রামাযান মাসে অন্য মাসের তুলনায় বেশী ইবাদাত করতে পারে কিন্তু অন্য মাসে কখনও আল্লাকে ভুলে যেতে পারেনা। আল্লাহ আমাদের আমরণ তাঁর পূর্ণ আনুগত্যের উপর থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন!

লেখক:
(আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী)
অধ্যক্ষ- মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা।
ও আলোচক- পিস.টি.ভি বাংলা।

এডিটর:
আবু তালিব
শিক্ষক- মাদরাসাতুল হাদীস,
নাজির বাজার, ঢাকা।

আপনার নেটওর্য়াকে শেয়ার করুন

1 comment

  1. খুব ভাল হয়েছে। চালিয়ে যান। মূলত রামাযন হচ্ছে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এখান থেকে ঈমান, আমল ও তাকওয়ার প্রশিক্ষণ নিয়ে বাকী এগার মাসে রামাযানের শিক্ষা বাস্তবে রূপান্তরিত করতে হবে। তাহলেই রামাযান মুসলিমদের জীবনে কল্যাণ বয়ে আনবে। ধন্যবাদ

Leave a comment