“লাইলাতুল কাদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম রজনী”

by shahidullah on July 31, 2012

in আমাদের প্রবন্ধ, বিবিধ, সিয়াম, বিবিধ, বাংলা, আরবী

আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ – وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ – لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ – تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ – سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ
আয়াতের সরল অনুবাদ:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, (১) নিশ্চয়ই আমি এটা (আল কুরআন) অবতীর্ণ করেছি মহিমাম্বিত রজনীতে। (২) আর মাহিমান্বিত রজনী সম্পর্কে তুমি কি জান? (৩) মাহিমাম্বিত রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম, (৪) ঐ রাত্রিতে ফিরেশতাগণ ও রুহ (জিবরীল) প্রত্যেক কাজের জন্য অবতরণ করেন তাদের রবের অনুমতিক্রমে। (৫) আর এ শান্তিপূর্ণ অবস্থা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (১-৫ সূরা আল কাদর)

আয়াত অবতরণের প্রেক্ষাপট:
আলোচ্য আয়াত সমূহ সূরা “আল কাদর” এর। সূরা আল কাদর মাক্কী না মাদানী এ বিষয়ে যথেষ্ট মতামত রয়েছে, কেউ বলেন- মাক্কী, আবার কেউ বলেন মাদানী। ইমাম কুরতুবী (রহ) মাদানী হওয়াকে প্রাধান্য দিয়েছেন। আবার ইমাম মাওয়াবদী (রহ) মাক্কী হওয়াকে প্রাধান্য দিয়েছেন, অত্র সূরাটির শানে নযুল সম্পর্কে কিছু নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট উল্লেখ করা হয়, মূলতঃ এসব বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত হয় নি।
আলোচ্য বিষয়:
অত্র আয়াতসমূহে আল্লাহ তা‘আলা কুরআন অবতীর্ণের রাত এবং সে রাতের মর্যাদা ও তাৎপর্য শীর্ষক আলোচনা তুলে ধরেছেন। আর এ রাতটিই হল মহিমাম্বিত কাদরের রাত্রি।
লাইলাতুল কাদর এর নামকরণ:
এ রাতটিকে কাদরের রাত বলা হয় দু’টি কারণে: ১। এ রাত্রিতে আল্লাহ তা‘আলা আগামী এক বৎসরের তাকদীর বা ভাগ্যের বিষয়গুলি নির্ধারণ করে থাকেন তাই এ রাতটিকে লাইলাতুল কাদর বা ভাগ্য রজনী বলা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ যে রাতে প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ কর্ম স্থিরকৃত করা হয়।” (সূরা দুখান: ৩)
২। কাদর শব্দের অর্থ সম্মানিত ও মর্যাদাশীল, যেহেতু এ রাতটি অন্য রাতের চেয়ে মর্যাদাশীল ও সম্মানিত তাই এ রাতটিকে লাইলাতুল কাদর বলা হয়।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী হতে এ রাতটির মাহাত্ম ও মর্যাদা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে এ রাতটি হলো পবিত্র কুরআন অবতীর্ণের রাত। লাওহে মাহফুয হতে প্রথম আসমানে এরাতেই সম্পূর্ণ কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হয়। অতঃপর সেখান থেকে দীর্ঘ ২৩ বছরে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে নবী মুহাম্মদ (সা) এর কাছে কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হয়। এ রাতটির ইবাদাত লাইলাতুল কাদর বিহীন এক হাজার মাসের অর্থাৎ প্রায় ৮৪ বছর ইবাদাতের চেয়েও অধিক মর্যাদা পূর্ণ। এছাড়াও এ রাতটির অনেক মর্যাদা ও ফযীলত রয়েছে।
লাইলাতুল কাদর জাগরণ: নাবী (সা) বলেন, من قام ليلة القدر إيماناو احتسابا غفرله ما تقدم من ذنبه যে ব্যক্তি পুণ্যের আশায় ঈমানের সাথে লাইলাতুল কাদর জাগরণ করবে তার পূর্বের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (বুখারী) এ হাদীসে যদিও সগীরা গুণাহ উদ্দেশ্য কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি শরীয়তসম্মত ইবাদাতের মাধ্যমে রাত্রি জাগরণ করে এবং আল্লাহর কাছে স্বীয় অপরাধের জন্য সত্যিকার তাওবা করে তাহলে আশা করা যায় সে জীবনের সগীরা ও কবীরা সকল প্রকার গুণাহ মাফ করে নিতে পারবে। নবী (সা) নিজে লাইলাতুল কাদর এর উদ্দেশ্যে শেষ দশকের রাত্রিগুলি জাগরণ করেছেন এবং স্ত্রী ও পরিবারের সকলকে জাগরণের জন্য উৎসাহিত করে তুলেছেন। রাত্রি জাগরণের জন্য তারাবীহ বা তাহাজ্জুদের নামায ছাড়া অন্য কোন বিশেষ নামায সহীহ হাদীসে প্রমাণিত হয় নি। তাই প্রমাণহীন ইবাদত বন্দেগী এবং অনুষ্ঠানিকতা বর্জন করে তারাবীহ বা তাহাজ্জুদ নামায, কুরআন তিলাওয়াত তাসবীহ তাহলীল ও দু‘আ দরুদ এবং আল্লাহর কাছে কাঁদাকাটার মাধ্যমে রাত্রি জাগরণ করা উচিত।
লাইলাতুল কাদরের বিশেষ দু‘আ: আয়িশা (রা) বলেন: আমি জিজ্ঞাসা করলাম হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি লাইলাতুল কাদরের রাতটি জাগতে পারি তাহলে সে রাত্রে কি পাঠ করব? রাসূল (সা) বলেন: এ দুআ পাঠ কর: اللهم إنك عفو تحب العفو فاعف عني
হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল এবং ক্ষমা পছন্দ করেন এতএব আমাকে ক্ষমা করুন। (তিরমিযী সহীহ) এই দু‘আটি ছাড়া আর অন্য কোন বিশেষ দু‘আর প্রমাণ পাওয়া যায় না। সুতরাং কুরআন ও হাদীসে প্রমাণিত নিজের পরিবার পরিজনের ও সকল মুসলিম সমাজের জন্য দু‘আ করা উচিত। আরবী ভাষায় অপারগ হলে নিজের ভাষায় দু‘আ করবে।
লায়লাতুল কাদর কোন রাতটি:
রামাযান মাসের শেষ দশকের কোন রাতটি লাইলাতুল কাদর? এ সম্পর্কে আমাদের সমাজের প্রচলন অনুযায়ী মনে হয় ২৭ শে রাতটিই লাইলাতুল কাদর, আর অন্য কোন রাত হতে পারে না।
মূলতঃ এ ধরনের ধারণা হিকমাত পরিপন্থী, কারণ সহীহ হাদীস গুলো পর্যালোচনা করে দেখলে পাওয়া যায় প্রতি বছর একই রাত্রিতে লাইলাতুল কাদর হয় না। তাইতো কোন সহীহ হাদীসে ২৩ শের ইঙ্গিত আবার কোন হাদীসে ২৫ শের ইঙ্গিত আবার কোন হাদীসে ২৭ শের বা ২৯ শের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অপরপক্ষে নবী (সা) এর আমল ও বক্তব্যও অনুরূপ, কারণ শুধু একটি রাত্রেই প্রতি বছর লাইলাতুল কাদর হলে তিনি শেষ দশকের প্রতিটি রাত লাইলাতুল কাদরের উদ্দেশ্য জাগরণ করতেন না এবং বলতেনও না যে তোমরা শেষ দশকের বেজোড় রাত গুলিতে লাইলাতুল কাদর অনুসন্ধান কর। অবশ্য নবী (সা) কে লাইলাতুল কাদরের নির্দিষ্ট রাতটি অবগত করানো হয়েছিল, পরক্ষণেই আবার ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে, বিশেষ হিকমাতের কারণে, আর তা হলো যাতে বান্দাগণ আল্লাহকে বেশী স্মরণ করতে পারে এবং বেশী ইবাদতে রত থাকতে পারে।

উপসংহার: লাইলাতুল কাদর একটি বড় মর্যাদাশীল রজনী যা ইবাদাতের মাধ্যমে জাগরণ করতে পারলে সহস্র মাসেরও বেশি ইবাদাতের পুণ্য অর্জন সম্ভব হবে। আর সে রাতটি পেতে হলে একটি রাত নিদিষ্ট না করে নবী (সা) এর সুন্নাত অনুযায়ী শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলি অনুষ্ঠানিকতা, আয়োজন বিয়োজন ও বেদআতী প্রচলন বর্জন করে শরীয়ত সম্মত ইবাদাতের মাধ্যমে জাগরণ করা উচিত। আল্লাহ আমাদের সকলকে সে তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখক:
(আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী)
অধ্যক্ষ- মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা।
ও আলোচক- পিস.টি.ভি বাংলা।

এডিটর:
আবু তালিব
শিক্ষক- মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা।

আপনার নেটওর্য়াকে শেয়ার করুন

{ 0 comments… add one now }

Previous post:

Next post: