তোমরা হীনবল হইও না…

by shahidullah on June 8, 2012

in আমাদের প্রবন্ধ, বিবিধ, বিবিধ, বাংলা, আরবী

আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
وَلاَ تَهِنُوا وَلاَ تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ – إِن يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِّثْلُهُ وَتِلْكَ الأيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللّهُ الَّذِينَ آمَنُواْ وَيَتَّخِذَ مِنكُمْ شُهَدَاء وَاللّهُ لاَ يُحِبُّ الظَّالِمِينَ

সরল অনুবাদ:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তোমরা হীনবল হইও না এবং দুঃখিতও হইও না, তোমরাই বিজয়ী যদি তোমরা মুমিন হও। যদি তোমরা আহত হয়ে থাক (জেনে রাখ) তারাও অনুরূপ আহত হয়েছিল। আমি মানুষের মাঝে পর্যায়ক্রমে এই দিনগুলোর (জয়-পরাজয়ের) আবর্তন ঘটাই, যাতে আল্লাহ মুমিনগণকে জানতে পারেন এবং তোমাদের মধ্যে হতে কতককে শহীদ রূপে গ্রহণ করতে পারেন। আর আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।” (সূরা আলে ইমরান ঃ ১৩৯-১৪০)

আয়াত অবতরণের প্রোপট:
আলোচ্য আয়াত দুটি সূরা আলে ইমরানের অন্তর্গত। সূরা আলে ইমরান মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। তৃতীয় হিজরীতে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে অধিক সংখ্যক সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন, এমনকি নাবী নিজেও বড় ধরনের আঘাতপ্রাপ্ত হন। ফলে মুসলিম সমাজ মানসিকভাবে ব্যথিত হন, এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াত সমূহ অবতীর্ণ করে সান্ত্বনা প্রদান করে।

আয়াতের আলোচ্য বিষয়:

আলোচ্য আয়াত দুটি মূলত ঃ ব্যথিত মুসলিম সমাজকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য অবতীর্ণ হয়। আয়াত দুটির আলোচ্য বিষয় হলো ঃ (১) ঈমানী শক্তিই প্রকৃত শক্তি, ঈমানী শক্তি দুর্বল হলেই সকল দুর্বলতা মানুষকে গ্রাস করে, আর ঈামনী শক্তি সবল হলে বিজয়ের দার উন্মুক্ত হয়, যার প্রমাণ হল, পাশাপাশি দুটি বড় যুদ্ধ- বদর ও উহুদ। (২) ঈমানদারদেরকে আল্লাহ তা‘আলা বিজয় দান করেন, আবার কখনো ব্যথা ও দুঃখ কষ্ট দিয়ে পরীা করেন, এটা শুধু ঈমান দুর্বল হলেই নয় বরং ঈমান মজবুত হলেও বহু পরীার সুম্মখীন হতে হয়।

আয়াতের সংক্ষিপ্ত তাফসীর:
১৩৯: “তোমরা হীনবল হইওনা … ” হিজরী ৩য় বর্ষে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিম দল বিজয় লাভ করলেও সামান্য ত্র“টির কারণে মুসলিম দল অমুসলিমদের পুনঃআক্রমণের সম্মুখীন হন। এতে ৭০ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন, যাদের মাঝে ছিলেন আমীর হামযা (রা) এর মত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহাবী, এমনকি স্বয়ং নাবী তার জীবনে সংঘটিত ১৯টি যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আঘাতপ্রাপ্ত হন এ যুদ্ধে এবং অর্থনৈতিক ভাবেও তিগ্রস্ত হন- ইত্যাদি নানা কারণে মুসলিম সমাজ মানসিকভাবে হীনবল হয়ে পড়েন, ব্যথিত হন- তখন আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় বান্দাদের সান্ত্বনা ও সাহস দিয়ে বলেন: “তোমরা হীনবল হইও না এবং দুঃখিতও হইও না, তোমরাই বিজয়ী যদি মুমিন হয়ে থাক।” আল্লাহ তা‘আলার এ আয়াত একদিকে যেমন সান্ত্বনা ও আশার বাণী, অপর দিকে আবার ঈমানকে মজবুত ও সুদৃঢ় করার তাগিদ ও সতর্কবাণী। আল্লাহ তাআলার এ ঘোষণা শুধু উহুদে তিগ্রস্ত হওয়া সাহাবীদের জন্য নয়, বরং সকল প্রোপটে সকল মুসলিমের জন্য প্রজোয্য। এতএব আমরা যারা আজ দীনী কর্মকাণ্ডে দুর্বল হয়ে পড়েছি আমাদের হীনবল না হয়ে ঈমানী চেতনায় সবল হওয়া উচিত।

১৪০ ঃ “যদি তোমরা আহত হয়ে থাক ….।” এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আরো সান্ত্বনা দিচ্ছেন এবং তাঁদের ব্যথা বেদনা ও দুঃখ জ্বালাকে সহজ করে দিচ্ছেন। আল্লাহ বলেন, তোমরা যেমন উহুদে আহত হয়েছ তারাও তেমন বদরে আহত হয়েছে। আর পার্থিব জীবনের নিয়মই হল এক পরে বিজয় অপর পরে পরাজয়, এটাই আল্লাহর নীতি অতএব পরাজয় হলে তারা ত্র“টিতে রয়েছে এমন কথা নয় বরং আল্লাহ তা‘আলা পরীা করার জন্যই অনেক সময় হক পন্থীদেরকেও বিজয় দেন না এরই প্রমাণ হল উহুদের যুদ্ধ। অনুরূপ এ যুদ্ধে বিজয় না দেয়ার আরো দুটি দিক হল, বিপদেও যারা ঈমানে অটল থাকে তাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো, মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচন করা এবং শাহাদাতের মর্যাদা দিয়ে কাউকে আল্লাহর পানে গ্রহণ করে নেয়া। তাঁরা হলেন- হামযা (রা) সহ ৭০ জন মর্যাদাশীল শহীদ। পরিশেষে আল্লাহ বলেন- তিনি যালিমদের ভালবাসেন না। যালিম বা অত্যাচারী অর্থই অমুসলিম নয়, বরং মুসলিমদের মাঝেও যুলুমনীতি কেউ গ্রহণ করলে আল্লাহ তাকে অপছন্দ করেন। অতএব যুলম সর্বদাই বর্জনীয়।

আয়াতের শিক্ষা:
আলোচ্য আয়াত দুটি হতে নানাবিধ শিা পাওয়া যায়, তন্মধ্যে নিম্নরূপ:
(ক) মুমিন সমাজ যে সময় ও যে প্রোপটেই হোক না কেন, তাঁর ব্যথিত ও হীনবল হওয়া উচিত নয় বরং ঈমানী বলে বলিয়ান হয়ে তাকে উঠে দাঁড়াতে হবে, কেননা দুনিয়ার সম্মান-মর্যাদায় জয়-বিজয়, পদ ও প্রভাব এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ তার ল্য উদ্দেশ্য নয় বরং তাঁর ল্য উদ্দেশ্য
হলো, ওপারের অসীম জীবনের সুখ শান্তি। মহান আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি। এ আয়াত আমাদের শিা দেয়- বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস এর কর্মীদের বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাত ও বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হয়ে হীনবল হলে চলবে না, বরং ইসলামপন্থী হিসাবে ভিতরের ও বাইরের দেশী ও বিদেশী সকল অপবাদ ও বাধা বিপত্তিকে এড়িয়ে দীর্ঘদিন পর নব নির্বাচিত দায়িত্বশীলদের মহান আমানতের কথা স্মরণ করে ঈমানী শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে তাওহীদী চেতনায় সামনে অগ্রসর হতে হবে।
(খ) উহুদের যুদ্ধে মুসলিম সমাজ আহত ও ব্যথিত হওয়ার পেছনে যে ত্র“টি ছিল তা হল কিছু দায়িত্বশীলের আনুগত্যে দুর্বলতা। অতএব মুসলিম ব্যক্তিকে তাঁর ল্যও উদ্দেশ্যে পৌঁছতে হলে নেতার আনুগত্যে কোন ত্র“টি করা চলবে না, কিন্তু আজ আমরা আনুগত্যহীনতার রোগেই বেশী ভুগছি, সকলেই নিজেকে বড় ভাবছি এবং নেতার ভাব প্রকাশ করছি। এ স্বভাব নিজকে এবং গোটা জাতিকে তিগ্রস্ত করবে, ফলে আমাদের সকলের আনুগত্যশীল হওয়া উচিত
(গ) পার্থিব জীবনে বিজয় হবেই এমন কথা নয় বরং জয়-বিজয়ের পালা পর্যায়ক্রমে চলবে এটাই মহান আল্লাহর নিয়মনীতি, হকপন্থীদের কখনও পরাজয় দেখা দিলে তা আল্লাহর পক্ষ হতে পরীক্ষা মনে করে সামনে আরো অগ্রগামী হতে হবে, প্রয়োজনে নিজের পদ ও সম্পদ বিসর্জন দিয়েও আল্লাহর পথে অগ্রসর হতে হবে। হয়তবা এ পথে শাহাদাতের সুধাও পান করতে হবে। আর সেই তো হবে প্রকৃত সৌভাগ্যবান ও মর্যাদাশীল।
অনুরূপ এ আয়াত শিক্ষা দেয়, আমাদের সকলকে হতে হবে ন্যায় নিষ্ঠাবান, অপরের প্রতি কখনও যুলুম ও অবিচার নয়। কারণ আল্লাহ তা‘আলা ব্যক্তি হতে শাসক পর্যন্ত কারো যুলুমকে পছন্দ করেন না।
পরিশেষে আমরা যেন সর্বেেত্র ঈমানী বলে বলিয়ান হয়ে আমাদের ঈমানী কর্মকাণ্ডকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি, মহান আল্লাহর কাছে এ তাওফীক চেয়েই শেষ করছি। হে আল্লাহ তাওফীক দিন, আমীন।

(আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী)
অধ্যক্ষ
মাদরাসাতুল হাদীস
নাজির বাজার, ঢাকা।

আপনার নেটওর্য়াকে শেয়ার করুন

{ 0 comments… add one now }

Previous post:

Next post: