“ইসরা ও মি‘রাজ প্রসঙ্গ”

অডিও ডাউনলোড করুন:

অডিও ডাউনলোড করুন: (01-05-2015)

বংশাল মসজিদ জুমার খুতবাঃ (০৮-০৫-২০১৫)

 

 

প্রসঙ্গ কথা: ইসলাম এমন একটি জীবনাদর্শ যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, ইহা সম্পূর্ণ আল্লাহ তা‘আলার প হতে প্রেরিত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন ঃ
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللّهِ الإِسْلاَمُ
“নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য দীন ইসলাম” (সূরা আলে ইমরান ঃ ১৯)
ইসলাম ধর্মের আরো একটি বৈশিষ্ট্য হলো যে, নবী (সা) এর নবূওয়াতী জীবন সমাপ্তির মাধ্যমে ইসলাম পূর্ণতা লাভ করেছে তাইতো নবী (সা)) এর বিদায় হাজ্জে অবতীর্ণ হলো:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নি‘আমাত পরিপূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম।” (সূরা আল মায়িদাহ ঃ ৩)
সুতরাং ইসলামে কারো প হতে কোনরূপ সংযোজন ও বিয়োজনের অবকাশ নেই। এজন্যই ইবাদাতের নামে কোন কর্মে লিপ্ত হয়ে সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করলেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না, যদি তা হয় নবাবি®কৃত। নবী (সা) বলেন ঃ
من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهورد
“যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ (ইবাদাত) করে, যে ব্যাপারে আমাদের কোন আদেশ-নির্দেশ নেই তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য, কখনও গ্রহণযোগ্য হবে না।” (সহীহ মুসলিম)
অতএব প্রচলিত শবে মি‘রাজ উদ্যাপন সম্পর্কে আমরা যদি একটু চিন্তা করি, তাহলে আমাদের এসব ইবাদাতের গোপন রহস্য উদঘাটিত হয়ে যাবে। আমরা খুঁজে পাব সঠিক পথের দিশা। আসুন! আল কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে শবে মি‘রাজ উদযাপন সম্পর্কে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করি।


ইসরা ও মি‘রাজের পরিচয়:

ইসরা আরবী শব্দ, অর্থ হলো রাত্রি বেলা ভ্রমণ করা। ইসলামী পরিভাষায় নবী (সা) এর বিশেষ মু‘জিযা স্বরূপ তাঁকে মাসজিদে হারাম এর চত্ত্বর হতে মাসজিদে আকসা পর্যন্ত রাত্রিবেলায় জিবরাঈলের সাথে বিশেষ বাহনে জাগ্রতাবস্থায় যে ভ্রমণ করানো হয় তাকে ইসরা বলা হয়।
মি‘রাজ শব্দটিও আরবী, অর্থ হলো উর্ধ্বগমনের মাধ্যম, যা উর্ধ্বগমন অর্থেও ব্যবহৃত হয়। ইসলামী পরিভাষায় নবী (সা) মাসজিদে আকসা হতে সপ্ত আসমান ও তদুর্ধ্বে সশরীরে জাগ্রতাবস্থায় আরোহন এবং বিভিন্ন নিদর্শন পরিদর্শন করার যে মুজিযা লাভ করেন তাকেই মি‘রাজ বলা হয়। (শারহু আকীদাহ আত-তাহাবীয়্যাহ ঃ ২২৩)

ইসরা ও মি‘রাজের সত্যতা ও মু‘জিযাঃ
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) বলেন ঃ নবী (সা) এর নবূওয়াত লাভের পর সশরীরে আত্মা ও দেহসহ জাগ্রতাবস্থায় একই রাত্রে ইসরা ও মিরাজ সংঘটিত হয়। এটাই অধিকাংশ বিদ্বানের মত ও এটাই সঠিক মত। (ফাতহুল বারী ১/৫৯৬ পৃষ্ঠা)
আল্লাহ তা‘আলা ইসরা সম্পর্কে বলেন:
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الأَقْصَى
“পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছেন মাসজিদে হারাম হতে মাসজিদে আকসা পর্যন্ত।” (সূরা বানী ইসরাঈল: ১)
তিনি মি‘রাজ সম্পর্কে বলেন:
وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى – عِندَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى – عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى – إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَى – مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى – لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى
“নিশ্চয় সে তাকে আরেকবার দেখেছিল সিদরাতুল মুন্তাহার নিকটে, যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত, যখন বৃটি যা দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার, তদ্বারা আচ্ছন্ন ছিল, তাঁর দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি এবং সীমালঙ্ঘন করেনি। নিশ্চয় সে তার পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে।” (সূরা আন নাজম: ১৩-১৮)
এ হলো আল কুরআনের ভাষ্য, আর বুখারী মুসলিমসহ অসংখ্য সহীহ হাদীসে নবী (সা) এর ইসরা ও মি‘রাজের ইতিবৃত্ত বর্ণিত হয়েছে যা এক দীর্ঘ আলোচনা। মোটকথা ইসরা ও মি‘রাজ ছিল বাস্তব সশরীরে ও জাগ্রতাবস্থায়, যা আল্লাহর প হতে নবী (সা) এর জন্য এক বিশেষ মুজিযা এবং এটা হল তাঁর নবূওয়াত ও রিসালাতের সত্যতা প্রমাণের এক বলিষ্ঠ দলীল

প্রচলিত শবে মি‘রাজ উদযাপন:
হিজরী বর্ষের রজব মাস এলেই সে মাসের একটি রাত বা গোটা মাসই একশ্রেণীর মুসলমান শবে মি‘রাজের (মিরাজের রাতের) দোহাই দিয়ে নানা রকম আনন্দোৎসব, মনগড়া ‘ইবাদাত বন্দেগী, ওয়াজ মাহফিল ও খাজাবাবার সিন্নি বিতরণ, চাঁদাবাজি ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো যে, সে সকল মুসলিম এবং তাদের আলিম মুরশিদেরা একটুও চিন্তা করলেন না যে, এ প্রচলিত শবে মিরাজ উদযাপনের কোন ভিত্তি আছে কিনা? তাই সচেতন মুসলিম সমাজের খিদমতে বলতে চাই, আসুন! আমরা একটু চিন্তা করি, যদি সত্যিই ইসলামে এর সঠিকতা প্রমাণিত হয়ে থাকে, তবে নিশ্চয় এ ইবাদাত পালন করলে পুণ্যের অধিকারী হব। আর যদি এর সঠিকতা প্রমাণিত না হয়, তবে নিশ্চয় এটি ইবাদাতের নামে প্রচলিত এক ভ্রান্ত বিদ‘আত যা মানুষকে জান্নাতের পথ হতে সরিয়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে (নাউযুবিল্লাহ মিন যালিক)। তাই আসুন! আমরা প্রচলিত শবে মি‘রাজের দিন-তারিখের সত্যতা, অতঃপর মি‘রাজকে কেন্দ্র করে নামায, রোযা ইত্যাদি ‘ইবাদাতের সঠিকতা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে পর্যালোচনা করি।

মি‘রাজের দিন তারিখ:
পূর্বের আলোচনা হতে প্রমাণিত হয় যে, ইসরা ও মি‘রাজ একটি সুপ্রসিদ্ধ ঘটনা যা কুরআন ও সহীহ হাদীসে প্রমাণিত, এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু ইসরা ও মি‘রাজ কোন দিন, মাস ও বছরে সংঘটিত হয়েছে- এ ব্যাপারে কুরআন ও সহীহ হাদীসে স্পষ্ট ও অস্পষ্ট কোনরূপই বক্তব্য না থাকায় বিদ্বানগণ বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন: নবী (সা) এর নবুওয়াত লাভের পূর্বেই মি‘রাজ সংঘটিত হয়েছে, কিন্তু এটা যথার্থ নয়। তবে অধিকাংশ বিদ্বানই বলেছেন: নবূওয়াত লাভের পরেই সংঘটিত হয়েছে। এখন নবূওয়াতের কোন বর্ষে, মাসে ও দিনে সংঘটিত হয়েছে- এ নিয়ে আবার একাধিক মতামত পাওয়া যায়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতসমূহ সংপ্তি পর্যালোচনাসহ নিম্নে আলোকপাত করা হলো ঃ
১। নবূওয়াত লাভের বছরই মি‘রাজ সংঘটিত হয়।
২। নবূওয়াত লাভের পাঁচ বছর পর মি‘রাজ সংঘটিত হয়।
৩। নবূওয়াতের দশম বছরে রজব মাসের ২৭ শে রাত্রিতে।
৪। হিজরতের এক বছর পূর্বে অর্থাৎ নবূওয়াতের ১২তম বছরে রবিউল আউয়াল মাসের ২৭ শে রাত্রিতে।
৫। হিজরতের আট মাস পূর্বে রামাযান মাসের ২৭ শে রাত্রিতে।
৬। হিজরতের ছয় মাস পূর্বে।
৭। হিজরতের এক বছর ও দুই মাস পূর্বে মুহাররাম মাসে।
৮। হিজরতের এক বছর ও তিন মাস পূর্বে যিলহাজ্জ মাসে।
৯। হিজরতের এক বছর ও পাঁচ মাস পূর্বে শাওয়াল বা রামাযান মাসে।
১০। হিজরতের পূর্বে রজব মাসের প্রথম শুক্রবার রাতে। ইত্যাদি আরো একাধিক মতামত পাওয়া যায়।
দ্রঃ আল আ’ইয়াদ (৩৫৯-৩৬০ পৃষ্ঠা) আর রাহীকুল মাখতুম (১৩৭ পৃষ্ঠা) আল বিদা আল হাওলিয়া (২৭০-২৭৪)।
সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা:
উপরোক্ত মতামতসমূহ হতে এটাই প্রমাণিত হয় যে, ইসরা ও মি‘রাজ সংঘটিত হওয়ার রাতটির তারিখ নির্ধারিতভাবে কারো জানা নেই, কেননা এর সঠিক কোন প্রমাণ নেই।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইমাম ইবনে কাসীর (রহ) বলেন ঃ যে হাদীসে বলা হয়েছে যে, ইসরা ও মি‘রাজ রজব মাসের ২৭ শে রাত্রিতে সংঘটিত হয়েছে সে হাদীস সঠিক নয় বরং এর কোন ভিত্তি নেই। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/১০৭ পৃষ্ঠা)
ইমাম আবূ শামাহ (রহ) বলেন:
“অনেক আলোচক বলে থাকেন যে, ইসরা ও মি‘রাজ রজব মাসে সংঘটিত হয়েছে; মূলতঃ এটা হাদীস শাস্ত্রের পণ্ডিতদের কাছে এক ডাহা মিথ্যা কথা।” (আল বায়েস ফী ইনকারিল বিদা: ৭১ পৃষ্ঠা)
যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ) বলেন:
“মিরাজ সংঘটিত হওয়ার মাস, দশক বা নির্ধারিত দিনের কোন অকাট্য প্রমাণ নেই।” (যাদুল মা‘আদ ১/৫৭ পৃষ্ঠা)
অতএব সমাজে প্রচলিত যে মতের উপর ভিত্তি করে শবে মি‘রাজ উদযাপন করা হয় সে মতটি হলো নবূওয়াতের দশম বছরে রজব মাসের ২৭ শে রাত্রিতে। আমরা প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও ইমামদের বক্তব্য অনুযায়ী অবগত হলাম যে, উক্ত মতটি সঠিক নয় বরং মিথ্যা। ইমামের বক্তব্য ছাড়াও আমরা যদি বাস্তব ইতিহাসের নিরিখে প্রমাণ করতে যাই, তবুও সে মতটি ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়। কারণ আমরা জানি, মি‘রাজের রাতেই পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়েছে, আর ইতিহাস প্রমাণ করে যে, খাদীজাহ (রা) যখন ইন্তিকাল করেন তখন পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়নি, তিনি ইন্তিকাল করেন নবূওয়াতের দশম বছরে রামাযান মাসে। তখনও পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়নি, তাহলে কীভাবে সে রামাযান মাসের দু’মাস পূর্বে রজব মাসে মি‘রাজ সংঘটিত হতে পারে। সুতরাং সমাজে প্রচলিত শবে মি‘রাজ উদযাপনের রাত বা মাসটি কুরআন ও সহীহ হাদীস এবং বাস্তব ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী এক বানোয়াট মিথ্যা তারিখ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। আর দিন তারিখই যদি সঠিক বলে প্রমাণিত না হয়, তাহলে এর উপর ভিত্তি করে ইবাদাতে লিপ্ত হওয়া কি প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং বোকামির পরিচয় নয়?

শবে মি‘রাজের বিদ‘আতী ইবাদত:
সামজে প্রচলিত শবে মি‘রাজকে কেন্দ্র করে রজব মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সালাত (নামায), সিয়াম (রোযা), মিলাদ-মাহফিল, রাত্রি জাগরণ, আনন্দোৎসব, খাজা বাবর সিন্নি বিতরণ ইত্যাদি রকমারী ‘ইবাদাতের আবিষ্কার হয়েছে এবং এক শ্রেণীর দাজ্জাল মিথ্যুক বহু রকমের জাল হাদীস ও কিস্সা কাহিনী তৈরী করে মানুষকে বিপথে নেয়ার অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। আসুন, আমরা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে এসব ইবাদাতের সত্যতা যাচাই করে দেখি।
১। সালাতুর রাগাইব:
রজব মাসকে কেন্দ্র করে যে বিশেষ সালাত আদায় করা হয়, তন্মধ্যে অন্যতম হলো ‘সালাতুর রাগাইব’। আনাস (রাযি) এর বরাত দিয়ে নবী (সা) হতে বর্ণনা করে বলা হয়, যে ব্যক্তি রজব মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার রোযা রেখে মাগরিব ও ইশার মাঝে দুই দুই করে বার রাক‘আত নামায পড়বে- প্রতি রাক‘আতে সূরা ফাতিহা, অতঃপর সূরা কাদর তিনবার এবং সূরা ইখলাস বরাবার- এভাবে নামায শেষে সত্তরবার দরূদ পাঠ করবে এবং বিশেষ মুনাজাত করবে, তাহলে এ নামায তার কবরে এসে তাকে যাবতীয় বিপদ মুসিবত হতে উদ্ধার করবে …। (নাউযুবিল্লাহ)
ইমাম গায্যালী (রহ) এর মত ব্যক্তি তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন এ (১/২০২-২০৩) বলেন ঃ এ নামাযের নাম হলো রজবের নামায, এটা মুস্তাহাব নামায, যদিও ঈদ ও তারাবীর নামাযের মত এটা প্রমাণিত নয়, কিন্তু ফিলিস্তিনবাসীদেরকে গুরুত্ব সহকারে এটা আদায় করতে দেখে আমি এ নামাযের উপস্থাপন করা ভাল মনে করছি।
মূলতঃ এসব ব্যক্তির এরূপ বক্তব্য ও গ্রন্থই মানুষকে বিদ‘আতের দিকে ধাবিত করার জন্য যথেষ্ট। কারণ এ নামায সম্পর্কিত বর্ণনাগুলো সকল মুহাদ্দিসের ঐকমত্যে জাল বানোয়াট ও মিথ্যা। (দ্রঃ কিতাবুল মাওযুয়াত ২/১২৪, ১২৫ পৃষ্ঠা)
বস্তুত ঃ এ সালাতুর রাগাইব সর্বপ্রথম ৪৮০ হিজরীতে ফিলিস্তিনে উদ্ভব ঘটে। এর পূর্বে নবী (সা), সাহাবীগণ, তাবিয়ীগণ এবং ৪৮১ হিজরীর পূর্বে কোন সালফে সালিহীন আদায় করেছেন বলে কোন সঠিক প্রমাণ নেই। (দ্রঃ আল হাওয়াদিস ওয়াল বিদা’ ১২২ পৃষ্ঠা)
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ) বলেন:
“সকল ইমামের ঐকমত্যে সালাতুর রাগাইব বিদ‘আত, কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা) বা কোন খলীফা কেউই এটা চালু করেননি এবং ইমাম মালিক, শাফিঈ, আহমাদ, আবু হানীফা, সাওরী, আওযাঈ, লাইস (রহ) ইত্যাদি কেউই এটা পছন্দ করেন নি। আর এ বিষয়ে যে হাদীস বর্ণনা করা হয় সকল মুহাদ্দিসের ঐকমত্যে তা মিথ্যা ও বানোয়াট।” (মাজমু ফাতাওয়া ২৩/১৩৪ পৃষ্ঠা)
অতএব শবে মি‘রাজকে কেন্দ্র করে সালাতুর রাগাইব সহ সকল প্রকার বিশেষ সালাত বিদ‘আত, যা হারাম হিসেবে অবশ্যই বর্জনীয়।
২। বিশেষ রোযা পালন:
শবে মি‘রাজকে কেন্দ্র করে রজব মাসের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত প্রতি বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও ২৬ তারিখে ইত্যাদি বিভিন্নভাবে বিভিন্ন দিনে রোযা রাখা সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত অনেক মিথ্যা ও জাল হাদীসের ছড়াছড়ি রয়েছে, দীর্ঘ হয়ে যাবে আশংকায় এখানে সে সব হাদীসের অবতারণা ভালো মনে না করে সে প্রসঙ্গে মুহাদ্দিসে কিরামদের কিছু বক্তব্য উল্লেখ করাই যথেষ্ট মনে করি।
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) বলেন:
“রজব মাসের ফযীলাত বর্ণনায় বা সে মাসে রোযার ফযীলাত বর্ণনায় অথবা এ মাসে কোন নির্দিষ্ট দিনে রোযা রাখা বা রাত্রি জাগরণ সম্পর্কে কোন প্রমাণযোগ্য কোন সহীহ হাদীস প্রমাণিত হয়নি।” (আল-বিদা আল-হাওলিয়া ঃ ২১৪ পৃষ্ঠা)
ইমাম ইবেন তাইমিয়াহ (রহ) বলেন:
“রজব মাসকে বিশেষভাবে সম্মান করা বিদ‘আতের অন্তর্ভুক্ত, আর এ মাসকে রোযার মৌসুম হিসাবে মনে করা ইমাম আহমাদ (রহ) সহ সকলেই অপছন্দ করতেন।” (ইকতিযাউস সিরাত ২/৬২৪, ৬২৫)
সুতরাং রজব মাসে বিশেষ রোযা রাখার ব্যাপারে সব হাদীসই দুর্বল বরং জাল বা বানোয়াট, যা কোন মুহাদ্দিসের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। অতএব তা অবশ্যই বর্জনীয়। (আল-বিদা আল-হাওলিয়া ২২৬ পৃষ্ঠা)
তাইতো সাহাবীদের অনেকেই এ মাসে বিশেষ রোযা রাখলে বাধা দিতেন। এমনকি আমীরুল মু’মিনীন ‘উমার (রা) যাদেরকে রোযা রাখতে দেখতেন তাদেরকে প্রহার করতেন এবং রোযা ভেঙ্গে ফেলার জন্য খেতে বাধ্য করতেন, আর বলতেন ঃ রজব এমন মাস, যাকে জাহিলী যুগের লোকেরা সম্মান করতো, বড় করে দেখাতো। (অতএব তোমরা এরূপ করো না)। (আল-বিদা আল-হাওলিয়া ২৩৪ পৃষ্ঠা)
৩। শবে মি‘রাজের আনুষ্ঠানিকতা:
তথাকথিত ২৭ শে রজবের রাত্রিটি শবে মি‘রাজ বা মি‘রাজের রজনী বলা হয়। এজন্য যে সব আনুষ্ঠানিকতা, মাসজিদে আলোকসজ্জা ও খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হয়, যার বর্ণনা দিতে গেলে এক ছোট পুস্তিকা পূর্ণ হয়ে যাবে, তাই সে সব অনর্থক কথাবার্তার অবতারণা না করে এ সম্পর্কে বিদ্বানদের কিছু বক্তব্য তুলে ধরতে চাই।
বিংশ শতাব্দীর বিশ্ববিখ্যাত আলিমে দীন আল্লামা খায়খ ইবনে বায (রহ) বলেন ঃ কোন মুসলিমের জন্য মি‘রাজের রজনীকে কেন্দ্র করে কোন প্রকার আনুষ্ঠানিকতায় লিপ্ত হওয়া বৈধ হবে না। কারণ নবী (সা) ও তাঁর সাহাবায়ে কিরামগণ (রা) মি‘রাজের রাতকে কেন্দ্র করে কোন প্রকার আনুষ্ঠানিকতা করেননি এবং বিশেষ কোন ‘ইবাদাতেরও প্রচলন ঘটান নি। অতএব এ আনুষ্ঠানিকতা যদি শারী‘আতসম্মত কাজ হতো তাহলে অবশ্যই নবী (সা) স্বীয় উম্মাতকে তাঁর কথা বা কাজের মাধ্যমে অবগত করাতেন এবং সাহাবীগণ তা বর্ণনা করতেন। সুতরাং এটা এক ভ্রান্ত বিদ‘আত, যা হতে বিরত থাকা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য। (দ্রঃ আল-বিদা ওয়াল মুহদাসাত ৫৮৯-৫৯০ পৃষ্ঠা)
৩। শবে মি‘রাজের আনুষ্ঠানিকতা:
তথাকথিত ২৭ শে রজবের রাত্রিটি শবে মি‘রাজ বা মি‘রাজের রজনী বলা হয়। এজন্য যে সব আনুষ্ঠানিকতা, মাসজিদে আলোকসজ্জা ও খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হয়, যার বর্ণনা দিতে গেলে আলোচনা দীর্ঘ হয়ে যাবে, তাই সে সব অনর্থক কথাবার্তার অবতারণা না করে এ সম্পর্কে বিদ্বানদের কিছু বক্তব্য তুলে ধরতে চাই।
বিংশ শতাব্দীর বিশ্ববিখ্যাত আলিমে দীন আল্লামা শায়খ ইবনে বায (রহ) বলেন ঃ কোন মুসলিমের জন্য মি‘রাজের রজনীকে কেন্দ্র করে কোন প্রকার আনুষ্ঠানিকতায় লিপ্ত হওয়া বৈধ হবে না। কারণ নবী (সা) ও তাঁর সাহাবায়ে কিরামগণ (রা) মি‘রাজের রাতকে কেন্দ্র করে কোন প্রকার আনুষ্ঠানিকতা করেননি এবং বিশেষ কোন ‘ইবাদাতেরও প্রচলন ঘটান নি। অতএব এ আনুষ্ঠানিকতা যদি শারী‘আতসম্মত কাজ হতো তাহলে অবশ্যই নবী (সা) স্বীয় উম্মাতকে তাঁর কথা বা কাজের মাধ্যমে অবগত করাতেন এবং সাহাবীগণ তা বর্ণনা করতেন। সুতরাং এটা এক ভ্রান্ত বিদ‘আত, যা হতে বিরত থাকা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য। (দ্রঃ আল-বিদা ওয়াল মুহদাসাত ৫৮৯-৫৯০ পৃষ্ঠা)
এ হলো মি‘রাজের রাত্রির আনুষ্ঠানিকতার কথা, আর এ আনুষ্ঠানিকতার সাথে যা কিছু হয়ে থাকে তা বলার অপো রাখে না, বিশেষ করে মাযারসমূহে এ দিনকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় গাজার আসর, শুরু হয় অবাধে নারী-পুরুষের যৌথভাবে গান-তামাসার আসর ইত্যাদি যা একজন জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি একটু চিন্তা করলেই বলবেন যে, এটা ইসলাম গর্হিত ও নিষিদ্ধ পাপ কর্ম ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করে এ সমস্ত ভ্রান্ত কাজ হতে রেহাই দান করুন- আমীন।
হে মুসলিম ভাই ও বোন! আল্লাহ আপনাকে রহম করুন। জেনে রাখুন, প্রতিটি মুসলিমের প্রত্যাবর্তন স্থল হলো কুরআন ও সহীহ হাদীস। এ দুইয়ের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়াই তার কর্তব্য এবং এ দুয়ের আলোকে যাবতীয় ‘ইবাদত সম্পাদন করাই হলো তার আদর্শ। তাই আসুন আমরা সংপ্তিভাবে আল কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে প্রচলিত শবে মি‘রাজ উদযাপনের পরিণতি জেনে নেই।
আল কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে প্রচলিত শবে মি‘রাজ উদযাপনের পরিণতি-

১- আল কুরআনের আলোকে:
আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনের সূরা বানী ইসরাঈল ও সূরা আন নাজামে ইসরা ও মি‘রাজের আলোচনা তুলে ধরেছেন, তাই এর প্রতি আমাদের অবশ্যই ঈমান আনতে হবে। কিন্তু প্রচলিত শবে মি‘রাজ উদযাপনের দিন-তারিখ বা আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে কুরআনের কোথাও কোনরূপ ইঙ্গিত নেই বরং আল্লাহ তা‘আলা বলেন ঃ
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا
“আর রাসূল তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে বারণ করেছেন তা হতে বিরত থাক।” (সূরা হাশর ঃ ৭)
আমরা দেখতে পাই, রাসূল (সা) এরূপ শবে মি‘রাজ উদ্যাপনের কোন আদেশ বা অনুমতি দিয়েছেন বলে এর সঠিক কোন প্রমাণ নেই। তাই এটা রাসূল (সা) এর অনুসরণ নয় বরং তার বিরোধিতা, আর আল্লাহ তা‘আলা বলেন ঃ
فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
“তাদের সতর্ক হয়ে যাওয়া উচিত যারা তাঁর (রাসূলের) আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, ফলে তাদেরকে ফিতনা বা বিপর্যয় পেয়ে যাবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে।” (সূরা নূর: ৬৩)
২- সহীহ হাদীসের আলোকে:
আল্লামা শায়খ ইবনে বায (রহ) বলেন: যে রাত্রে মি‘রাজ সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, সে রাতটি অথবা রজব মাস অথবা অন্য কোন রাত বা মাস নির্দিষ্টভাবে সহীহ হাদীসে প্রমাণিত হয়নি। বরং মি‘রাজের দিন-তারিখ সম্পর্কে যে সব বর্ণনা পাওয়া যায়- মুহাদ্দিসগণ বলেন ঃ সে সব বর্ণনা নবী (সা) হতে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত নয়। যদিও নির্দিষ্ট তারিখ প্রমাণিত হয় কিন্তু সে তারিখে বিশেষ কোন ইবাদাত করা যাবে বলে নবী (সা) ও সাহাবীদের হতে কোন প্রমাণ নেই… তাই সবই বিদ‘আতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত- যা বর্জন করাই হলো মুসলিম ব্যক্তির কতর্ব্য। (আল-বিদা ওয়াল মুহদাছাত ৫৮৯ পৃষ্ঠা)
সুতরাং শবে মি‘রাজকে কেন্দ্র করে বিশেষভাবে যে সব ‘ইবাদাত পালন করা হয় তা কখনও আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নবী (সা) বলেন:
من احدث فى امرناهذا ما ليس منه فهورد
“যে ব্যক্তি আমাদের এ (দীনের) কাজে এমন কিছু আবিষ্কার করবে যা তাতে ছিল না তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৭১৮)
কারণ এসব ‘ইবাদাত হলো বিদ‘আত যা ভ্রান্ত বা গুমরাহী। নবী (সা) বলেন-
كل محدثة بدعة كل بدعة ضلالة
“প্রতিটি নবাবি®কৃত ‘ইবাদতই হলো বিদ‘আত আর প্রতিটি বিদ‘আতই হলো ভ্রান্ত পথভ্রষ্টতা।” (আবূ দাউদ, তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ- সহীহ)
অন্য বর্ণনায় এসেছে:
وكل ضلالة فى النار
“সব গুমরাহীই জাহান্নামের পথে” (নাসায়ী- সহীহ)। অতএব প্রচলিত শবে মি‘রাজ উদযাপন মানুষের হিদায়াত নয় বরং যালালাত। গুমরাহী বা পথভ্রষ্টতা, যেহেতু তা ইসলামের ‘ইবাদাত নয়।

ইসরা ও মি‘রাজে করণীয় ও বর্জনীয়
ইসরা ও মি‘রাজ ইসলামের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এতএব মুসলিম উম্মাহর ইসরা ও মি‘রাজকে কেন্দ্র করে অবশ্যই কিছু করণীয় ও শিনীয় বিষয় রয়েছে। আবার প্রচলিত সমাজে ইসরা ও মি‘রাজকে কেন্দ্র করে অনেক বাহুল্যতা চালু হয়েছে যা অবশ্যই বর্জনীয়। নিম্নে সংপ্তিভাবে ইসরা ও মি‘রাজে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়সমূহ আলোকপাত করা হল:

ইসরা ও মি‘রাজের করণীয় ও শিনীয় বিষয়সমুহ:
১। ইসরা ও মি‘রাজের প্রতি ঈমান ঃ ইসরা ও মি‘রাজ ইসলামে একটি বাস্তব ও সত্য বিষয়। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে সূরা বানী ইসরাঈলে ১ম আয়াতে ইসরা বা মাসজিদে হারাম হতে মাসজিদে আকসা পর্যন্ত রাত্রিবেলা ভ্রমণের কথা বর্ণনা দিয়েছেন। আর সূরা নাজম- এর ১৩ হতে ১৮ আয়াতে মি‘রাজ বা উর্ধ্বগমনের বিষয় বর্ণনা দিয়েছেন। অপরপে সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম সহ অসংখ্য সহীহ হাদীসে ইসরা ও মি‘রাজ সংক্রান্ত নাবী (সা) ও সাহাবীদের বর্ণনাসমূহ স্থান পেয়েছে।
এতএব ইসরা ও মি‘রাজ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কুরআন ও সহীহ হাদীসে যেরূপ এর বর্ণনা এসেছে অনুরূপ এর প্রতি ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপন করা একটি অপরিহার্য কর্তব্য। ইমাম তাহাবী (রহ) আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আকীদাহ বিশ্বাস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন ঃ
“মি‘রাজ হক বা সত্য বিষয়, আরো হক কথা হলো যে, নাবী (সা) কে স্বশরীরে ও জাগ্রতাবস্থায় রাত্রিবেলা ভ্রমণ ও উর্ধ্বে গমন করানো হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা যত ইচ্ছা তাঁকে উর্ধ্বজগতে নিয়েছেন, তাঁকে সম্মানিত করেছেন এবং তঁাঁর প্রতি ওয়াহী করেছেন, আর তিনি যা দেখেছেন সত্যই বর্ণনা দিয়েছেন।” (শারহুল আকীদাহ আত-তাহাবীয়্যাহ ২২৩ পৃষ্ঠা)
সুতরাং এ বিষয়ে প্রথম করণীয় হল ইসরা ও মি‘রাজের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।

২। মি‘রাজের রজনীতে অবতীর্ণ হওয়া ‘ইবাদাত পালনে সচেষ্ট হওয়া:
আমরা অনেকেই শুনেছি যে, মি‘রাজের রাত্রে আল্লাহ তা‘আলার প হতে সবচেয়ে বড় নির্দেশ হল পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। আমাদের নাবী মুহাম্মদ (সা) মূসা (আ) এর পরামর্শে স্বীয় উম্মাতের প্রতি দয়াশীল হয়ে বারংবার আল্লাহর কাছে আবেদন করলে পঞ্চাশের স্থলে পাঁচ ওয়াক্ত নেমে আসে। অবশ্য আল্লাহর ঘোষণা হল ঃ “যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত সম্পাদন করবে সে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব লাভ করবে” (সহীহুল বুখারী হাদীস নং ৩৪৯)। এ হল ফযীলাতের বিষয় আর ধমকির বিষয় হল রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন ঃ
الفرق بين العبد والكفر ترك الصلاة
“একজন (মুসলিম) বান্দা ও কাফিরের মাঝে পার্থক্য হল সালাত বর্জন করা।” (সহীহ মুসলিম, মিশকাত ৪৮ পৃষ্ঠা)
এ হাদীসে সালাত বর্জনকারীকে কাফির বলা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হল মি‘রাজকে কেন্দ্র করে প্রচলিত সামাজে দুর্বল ও বানোয়াট প্রমাণের আলোকে রাত্রি জাগরণ, বিশেষ সালাত ও মিলাদ মাহফিল ইত্যাদির অপচর্চা শুরু হয়েছে। অথচ মি‘রাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, যা ব্যতীত কেউ পূর্ণ মু’মিন হতে পারে না- সেদিকে ঐ শ্রেণীর কোন গুরুত্ব নেই।
অতএব মি‘রাজের অন্যতম শিক্ষা হল: মি‘রাজ আমাদের পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যা পালন করা অপরিহার্য কর্তব্য।

৩। আল্লাহ তা‘আলার স্ব-সত্তায় উর্ধ্বে অবস্থান:
আহলু সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আকীদাহ বিশ্বাস বর্ণনাকারীর অন্যতম ইমাম- ইমাম ইবনু আবিল ইয্য আল-হানাফী (রহ) মি‘রাজ সংক্রান্ত আলোচনার শেষে বলেন:
“যে ব্যক্তি মি‘রাজের বিষয়ে চিন্তা করবে সে এতে আল্লাহ তা‘আলা উর্ধ্বে হওয়ার একাধিক দলীল প্রমাণ পেয়ে যাবে।” (শারহুল আকীদাহ আত-তাহাবীয়্যাহ ২২৬ পৃষ্ঠা)
সমাজে প্রচলিত “আল্লাহ তা‘আলা স্ব-সত্তায় সর্বত্র বিরাজমান” এরূপ বাতিল বিশ্বাস যা কুরআন ও সুন্নাহ পরিপন্থী, মি‘রাজের ঘটনাও প্রমাণ করে যে এটা বাতিল বিশ্বাস। বরং আল্লাহ তা‘আলা স্বসত্তায় উর্ধ্বে রয়েছেন, এটাই প্রমাণ করে মি‘রাজের বাস্তব ঘটনা।
কারণ নাবী (সা) মি‘রাজেই আল্লাহ তা‘আলার অতি নিকটে যাওয়ার সুযোগ পান এবং এ সুযোগ পৃথিবীর কোথাও ঘটেনি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্থান কা‘বাতেও আল্লাহর নিকটে যাওয়ার সুযোগ হয়নি, পূর্বেও নয়, পশ্চিমেও নয়, উত্তরেও নয়, দেিণও নয়: এমনকি নাবী রাসূলদের মিলনকেন্দ্র বাইতুল মাকদাসেও নয়। তথা তামাম পৃথিবীর কোথাও নয় বরং আল্লাহর স্ব-সত্তায় অবস্থান হল সপ্ত আসমানের উর্ধ্বে আরশে আযীমের উপরে। মূলতঃ এ পরিচয় আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াতে বিশেষ করে সাতটি আয়াতে পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, তিনি আরশের উপর সমুন্নত। যেমন:
الرحمن على العرش استوى

“দয়াময় (আল্লাহ) ‘আরশের উপর সমুন্নত।” (সূরা ত্ব-হা: ৫)
অতএব মি‘রাজ আমাদেরকে আল্লাহর স্ব-সত্তায় অবস্থান সম্পর্কে সঠিক আকীদাহ বিশ্বাস শিা দেয় যে, আল্লাহ তা‘আলা স্ব-সত্তায় সর্বত্র বিরাজমান নন, বরং তিনি স্ব-সত্তায় ‘আরশের উপরে রয়েছেন। এটাই হল সঠিক আকীদাহ বিশ্বাস। এটাই হল কুরআন ও সহীহ হাদীসের সঠিক বিশ্বাস। এর ঈমান ও বিশ্বাসের পরিপন্থী “আল্লাহ স্ব-সত্তায় সর্বত্র বিরাজমান” বিশ্বাস হল বাতিল ও কুফ্রী বিশ্বাস। এরূপ বিশ্বাসকারীকে ইমাম আবূ হানীফাও (রহ) কাফির বলে আখ্যায়িত করেছেন। (মুখতাসার আল উলু ১৩৬ পৃষ্ঠা)
অতএব মি‘রাজ সকল বাতিল বিশ্বাসকে নাকোচ করে সত্য ও সঠিক বিশ্বাসের বাস্তব শিাই আমাদের দিয়ে যায়।
৪। বক্তা ও আলোচকদের করুণ পরিণতি:
প্রসিদ্ধ সাহাবী আনাস (রা) বলেন, রাসূল (সা) বলেন ঃ আমি মি‘রাজের রজনীতে দেখলাম আগুনের কেচি দিয়ে কিছু মানুষের ওষ্ঠদয় কেটে নেয়া হচ্ছে (এ ‘আযাবের জ্বালা-যন্ত্রণায় তারা অস্থির)। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরীল! এরা কারা? তাদের এ করুণ অবস্থা কেন? জিবরীল বললেন ঃ এরা হল আপনার উম্মাতের বক্তা ও আলোচকবৃন্দ, যারা মানুষকে কল্যাণের আদেশ করত কিন্তু নিজেদের বিষয়টি ভুলে যেত, অথচ তারা কুরআন পড়ে, আসলে তারা কি কিছু উপলব্ধি করত না? (মুসনাদে আহমাদ – হাসান)
অনেক বক্তা ও আলোচক আছেন, যারা মানুষকে আলোচ্য বিষয় ভালভাবে উপলব্ধির জন্য নানা ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেন, যাতে শ্রোতা ভালভাবে বুঝে বাস্তবে তা পালন করতে পারে। পান্তরে আলোচক বা বক্তা নিজেই সে বিষয় বাস্তবে পালন করে না, এতে মনে হয় যেন সত্যিই সে নিজেই উপলব্ধি করতে পারেনি, তাই মানুষকে পালন করার উপদেশ দিলেও নিজে উদাসীন, পালন করে না- এমন ব্যক্তিদের জন্যই ভয়াবহ শাস্তি রয়েছে। মি‘রাজের বিষয় হতে আমাদের এ শিা গ্রহণ করে সতর্ক হওয়া উচিত।

৫। পরনিন্দাকারী ও ব্যভিচারীদের শাস্তিভোগ:
রাসূল (সা) মি‘রাজের রাত্রিতে আরো যে সব ব্যক্তির শাস্তিভোগ ও করুণ পরিণতি দেখেন, তন্মধ্যে হলো গীবত বা পরনিন্দাকারীদের করুণ শাস্তি। তিনি (সা) দেখলেন, একদল মানুস যাদের হাতের নখগুলো তামার এবং বিশাল আকৃতির ও খুব ধারালো, তারা ধারালো নখ দিয়ে নিজের চেহারা এবং ব হতে গোশত খামচিয়ে ছিড়ছে। নাবী (সা) জিবরীলকে জিজ্ঞেস করলেন, এরা কারা এবং কেন তাদের এ কঠিন শাস্তি? জবাবে জিবরীল বললেন ঃ তারা হল ঐসব মানুষ যারা অন্যের গোশত ভণ করতে এবং মানহানিকর কর্মে লিপ্ত হত। অর্থাৎ তারা গীবত-পরনিন্দা ও পর সমালোচনায় মগ্ন থাকত, এজন্য তাদের এ করুণ শাস্তি (মুসনাদে আহমাদ সহীহ)। অনুরূপ নাবী (সা) ব্যভিচারী নর-নারীদের করুণ শাস্তির দৃশ্যও স্বচে দেখেন এবং আমাদের বর্ণনা করেন।
মি‘রাজের বাস্তব চিত্র হতে এসব শিা গ্রহণ করে ঈমান ও আদর্শকে আরো সুন্দর করা উচিত।
ইসরা ও মি‘রাজে বর্জনীয় বিষয় সমূহ-
১। দিন তারিখ নির্দিষ্ট করা:
ইসরা ও মি‘রাজ নাবী (সা) এর জীবনে বাস্তব সংঘটিত হয়েছে, এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই, কিন্তু কোন সনে বা মাসে অথবা তারিখে সংঘটিত হয়েছে তার কোন সঠিক দলীল প্রমাণিত না হওয়ায় কোন দিন তারিখ নির্দিষ্ট করা সঠিক হবে না। বিশেষ করে এ তারিখের উপর নির্ভর করে যখন কোন ‘ইবাদাত চালু হয়ে যায় তখন বিষয়টি আরো খারাপ হয়। অতএব ইসলামে সঠিক দলীল না থাকায় কোন দিন তারিখ ধার্য করে নেয়া কখনও বৈধ হবে না।
২। ইসরা ও মি‘রাজে বিশেষ ‘ইবাদাত করা ঃ
ইসরা ও মি‘রাজ সংগঠিত হওয়ার নির্দিষ্ট দিন-তারিখ কোন বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য দলীল প্রমাণিত হয়নি এবং সে উপলে কোন বিশেষ ‘ইবাদাত, নামায, রোযা, তাসবীহ ও তিলাওয়াত ইত্যাদি পালনেও কোন সহীহ শুদ্ধ দলীল প্রমাণিত হয়নি। এতদসত্তেও আবেগবশতঃ কোন ‘ইবাদাতে লিপ্ত হলে সাওয়াবের পরিবর্তে গুণাহগার হতে হবে। কারণ মি‘রাজ রজনীকে কেন্দ্র করে নবী (সা) ও সাহাবীগণ (রা) বিশেষ কোন ইবাদাত করেননি এবং করার অনুমতিও দেননি। অতএব তথাকথিত শবে মি‘রাজের বিশেষ ‘ইবাদাত শরী‘আতসম্মত নয় বরং এটা একটি ভ্রান্ত ‘ইবাদাত যা মানুষকে গুমরাহ ও জাহান্নামের দিকেই নিয়ে যাবে। সুতরাং প্রচলিত সমাজের প্রথা বর্জন করা একান্ত প্রয়োজন।
৩। জাহিলী যুগের প্রথার অনুসরণ ও পুনঃপ্রচলন:
রাসূল (সা) ও সাহাবাদের মাঝে রজব মাসে মি‘রাজকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোন সালাত, সিয়াম ও কুরবানী ছিল না। কিন্তু তাঁর পূর্বে জাহিলী যুগে রজব মাসকে খুবই গুরুত্ব প্রদান করা হত। এ মাসে বিশেষ ইবাদাত নযর-নেয়াজ ও কুরবানী করা হত। সাহাবীদের যুগে যাতে জাহিলী অপচর্চা পুনঃপ্রচলন না হয় সেজন্য তাঁরা খুব কঠোর ছিলেন। যেমন ‘আমীরুল মু’মিনীন উমার বিন খাত্তাব (রা) এর যুগে যারা রজব মাসে বিশেষ রোযা পালন করত, তিনি তাদের গ্রেফতার করে প্রহার করতেন এবং রোযা ভেঙ্গে ফেলার জন্য বাধ্য করে খাওয়াতেন, আর বলতেন ঃ রজব এমন মাস যাকে জাহিলী যুগের লোকেরা সম্মান করত এবং বড় গুরুত্ব দিত। (আল বি‘দা আল হাওলিয়াহ ২৩৪ পৃষ্ঠা)
অতএব জাহিলী যুগে এ মাসের বিশেষ গুরুত্ব ও বিশেষ ইবাদাত ছিল, অতঃপর নাবী (সা) ও সাহাবীদের যুগে তা ছিল না বরং জাহিলী প্রথার প্রতিবাদ ছিল। সাহাবীদের স্বর্ণযুগের পর আবার কুরআন-সুন্নাহর অজ্ঞতা বেড়ে যাওয়ায় প্রবৃত্তির তাড়নায় ও শয়তানী প্ররোচনায় বর্তমান যুগের নামধারী কিছু মুসলিম সেই জাহিলী প্রথার অনুসরণ করে রজব মাসে বিশেষ ইবাদত প্রচলন করেছে। আল্লাহ ভীরু প্রতিটি মুসলিম ব্যক্তির কুরআন ও সহীহ হাদীস বিরোধী এ জাহিলী ইবাদত অবশ্যই বর্জনর করা উচিত। আল্লাহ তাওফীক দান করুন- আমীন।

৪। শবে মি‘রাজের আনুষ্ঠানিকতা:
মি‘রাজের রজনীকে কেন্দ্র করে প্রচলিত সমাজে বহু ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ও আয়োজন হয়ে থাকে। বিশেষ করে মাসজিদ-মাজার ইত্যাদি আলোকসজ্জা ও মিলাদ-মাহফিল এবং খাওয়া-দাওয়া এ সবই এমন একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে করা হয় যার (মি‘রাজের) বাস্তবতা থাকলেও আনুষাঙ্গিক কর্মকান্ড যা রজব মাসে হয়ে থাকে এর কোন সঠিক ভিত্তি না থাকায় এ অনর্থক কর্মকান্ড বর্জন করা অবশ্যই প্রতিটি মুসলিমের একান্ত কর্তব্য। ইহা ছাড়াও আরো বহু বর্জনীয় বিষয় রয়েছে। এখানে নমুনা স্বরূপ কিছু উল্লেখ করা হল।
উপসংহার ঃ উপসংহারে আমরা বলতে পারি ঃ (১) কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে ইসরা (রাত্রের ভ্রমণ- বাইতুল্লাহ হতে মাসজিদে আকসা পর্যন্ত) ও মি‘রাজ (উর্ধ্বগমন) সত্য ও বাস্তব, জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে নবূওয়াতের পর হিজরাতের পূর্বে মক্কা থাকাকালীন নবী (সা) এর এ মু‘জিযা সংঘটিত হয়েছে, এর প্রতি সকলকে ঈমান আনতে হবে।
(২) পবিত্র কুরআনে ও নবী (সা) এবং সাহাবীদের হতে বিশুদ্ধভাবে মি‘রাজের নির্দিষ্ট সাল, মাস ও দিন তারিখ প্রমাণিত হয়নি। তাই প্রচলিত হিজরী বছরের রজব মাসে ২৭ শে রাত্রে মি‘রাজ হওয়ার তারিখটি বানোয়াট ও অসত্য। অতএব তারিখই যদি ভিত্তিহীন হয় তাহলে কীভাবে সে তারিখে বিশেষ ইবাদাত ও অনুষ্ঠানাদি সঠিক হতে পারে?
(৩) তর্কের খাতিরে যদিও ধরে নেয়া হয় যে, ঐ তারিখেই মি‘রাজ হয়েছে তবুও প্রচলিত শবে মি‘রাজ উদ্যাপন ও ইবাদাত শারী‘আতসম্মত নয়। কারণ মি‘রাজের রাতকে কেন্দ্র করে নবী (সা) সাহাবীগণ, তাবিঈগণ, কেউ বিশেষ কোন নামায, রোযা করেছেন বা করার জন্য বলেছেন এর সঠিক কোন প্রমাণ নেই।
সুতরাং প্রচলিত শবে মি‘রাজকে কেন্দ্র করে সালাতুর রাগাইব, কোন রোযা, রাত্রি জাগরণ, আনুষ্ঠানিকতা, খানা-পিনার আয়োজন ও সিন্নি বিতরণ- সব কিছু বিদ‘আত বা গুনাহের কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ আমাদের অজ্ঞতা ও প্রবৃত্তির পূজা বর্জন করে সঠিক জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে ইসলামের ‘ইবাদত করার তাওফীক দান করুন এবং ইসরা ও মি‘রাজ হতে সঠিক শিা গ্রহণ করে নিজেদের ঈমান আকীদাহ ও আদর্শকে আরো সুন্দর করার তাওফিক দিন- আমীন!

******************************************

“প্রচলিত শবে মি’রাজ উদযাপন”::::

******************************************

আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ البَصِير
وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى – عِندَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى – عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى – إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَى – مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى – لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى

সরল অনুবাদ: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “পরম পবিত্র মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম হতে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি, যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শন সমূহ দেখাতে পারি, নিশ্চয়ই তিনি শ্রবণকারী ও দর্শনশীল।” (সূরা বানী ইসরাইল: ১)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: “নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখে ছিল সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে, যার কাছে জান্নাতুল মাওয়া অবস্থিত। যখন বৃটি যা দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার তদ্বারা আচ্ছন্ন ছিল, তার দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি এবং দৃষ্টি ল্যচ্যুতও হয়নি। নিশ্চয়ই সে তার পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী দেখেছে।” (সূরা নাজম, ১৩-১৮)

অবতরণের প্রেক্ষাপট:
আলোচ্য আয়াত সমূহ হতে প্রথম আয়াতটি সূরা বানী ইসরাইলের যা মক্কায় অবতীর্ণ হয়। এ আয়াত নবী (সা) এর বিশেষ মুজেয়া, এর প্রথম অংশ ইসরা অর্থাৎ মসজিদে হারাম হতে মসজিদে আকসা পর্যন্ত রাত্রি বেলায় ভ্রমণ এর সত্যতা প্রমাণের ল্েয অবতীর্ণ হয়।
বাকী আয়াত সমূহ সূরা নাজমের (১৩-১৮) আয়াত। এ সূরাটিও মক্কায় অবতীর্ণ হয়। এ আয়াতসমূহ নবী (সা) এর বিশেষ মুজেযার দ্বিতীয় অংশ মি’রাজ অর্থাৎ উর্ধ্বগমনের মাধ্যম বা উর্ধ্বগমন এর সত্যতা প্রমাণের ল্েয উক্ত আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয়।

আলোচ্য বিষয়:
উল্লেখিত আয়াত সমূহ সূরা বানী ইসরাইল ও নাজম হতে চয়ন করা হয়েছে। প্রথম আয়াতটি সূরা বানী ইসরাইলের ১নং আয়াত, যার আলোচ্য বিষয় হল ইসরা, অর্থাৎ রাত্রি বেলায় মসজিদে হারাম হতে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করা, এছাড়াও মসজিদে আকসার বৈশিষ্ট এ আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে। পরবর্তী বাকী আয়াত সমূহ হলো সূরা নাজমের (১৩-১৮) ছয়টি আয়াত, যাতে নবী (সা) এর মি’রাজ অর্থাৎ মসজিদে আকসা হতে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত উর্ধ্বগমন এবং সেখানে জিবরাইলকে স্বীয়আকৃতিতে দর্শন ও বিভিন্ন নিদর্শন সম্পর্কিত বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

ইসরা ও মি’রাজ এর পরিচয়:
ইসরা আরবী শব্দ, অর্থ হলো রাত্রি বেলা ভ্রমণ করা। ইসলামী পরিভাষায় ঃ নবী (সা) এর বিশেষ মুজিযা স্বরূপ তাকে মসজিদে হারাম এর চত্তর হতে মসজিদে আকসা পর্যন্ত রাত্রিবেলায় জিবরাইলের সাথে বিশেষ বাহনে জাগ্রতাবস্থায় ভ্রমণ করানো হয় তাকে ইসরা বলা হয়। মি’রাজ শব্দটিও আরবী, অর্থ হলো ঊর্ধ্ব গমনের মাধ্যম যা উর্ধ্বগমনের অর্থেও ব্যবহৃত হয়। ইসলামী পরিভাষায় নবী (সা) মসজিদে আকসা হতে সপ্ত আসমান ও তদূর্ধে স্বশরীরে জাগ্রতাবস্থায় আরোহন এবং বিভিন্ন নিদর্শন পরিদর্শন করার যে মুজিযা লাভ করেন তাকেই মি’রাজ বলা হয়। (শরহ আকীদাহ তাহাবীয়্যাহ- ২২৩)

ইসরা ও মি’রাজের সত্যতা:
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) বলেন নবী (সা) এর নবুওয়াত লাভের পর স্বশরীরে আত্মা ও দেহ সহ জাগ্রতাবস্থায় একই রাত্রে ইসরা ও মিরাজ সংঘঠিত হয়। ইহাই অধিকাংশ ইসলামী মনীষীদের মত এবং সঠিক মত। (ফতহুল বারী, ১৫/৪৪ পৃষ্ঠা)
আল্লাহ তা‘আলা ইসরা সম্পর্কে বলেন-
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ البَصِير
“পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম হতে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ….।” (বানী ইসরাঈল-১)
মি’রাজ সম্পর্কে বলন:
وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى – عِندَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى – عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى – إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَى – مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى – لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى
“নিশ্চয় সে তাকে আরেক বার দেখে ছিল, সিদরাতুল মুন্তাহার নিকটে যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত, যখন বৃটি যা দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার তদ্বারা আচ্ছন্ন ছিল, তাঁর দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি এবং সীমালংঘনও করেনি। নিশ্চয় সে তার পালকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে।” (সূরা আন নজম: ১৩-১৮)
এই হলো আল কুরআনের ভাষ্য, আর বুখারী, মুসলিম সহ অসংখ্য সহীহ হাদীসে নবী (সা) এর ইসরা ও মি’রাজের ইতিবৃত্ত বর্ণিত হয়েছে যা এক দীর্ঘ আলোচনা। মোট কথা এ ইসরা ও মি’রাজ ছিল বাস্তব স্বশরীরে ও জাগ্রতাবস্থায়, যা আল্লাহর প হতে নবী (সা) এর জন্য এক বিশেষ মুজেযা: এবং ইহা হল তাঁর নবুওয়াত ও রিসালাত এর সত্যতা প্রমাণের এক বলিষ্ঠ দলীল।

প্রচলিত শবে মি’রাজ উদযাপন:
হিজরী বর্ষের রজব মাস এলেই সে মাসের একটি রাত বা গোটা মাসই এক শ্রেণীর মুসলমানেরা শবে মি’রাজের (মি’রাজের রাতের) দোহাই দিয়ে নানা রকম আনন্দ উৎসব, মনগড়া ইবাদাত বন্দেগী, ওয়াজ মাহফীল ও খাজা বাবার সিন্নি বিতরণ, চাঁদাবাজি ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরে। কিন্তু দূঃখের বিষয় হলো যে, সে সকল মুসলিমেরা এবং তাদের আলিম মুরশিদরা একটুও চিন্তা করলেন না যে, এই প্রচলিত শবে মি’রাজ উদযাপনের কোন ভিত্তি আছে কিনা? তাই সচেতন মুসলিম সমাজের খিদমতে বলতে চাই আসুন আমরা একটু চিন্তা করি যদি সত্যিই ইসলামে এর সঠিকতা প্রমাণিত হয়ে থাকে, তবে নিশ্চয় এ ইবাদত পালন করলে পুন্যের অধিকারী হব। আর যদি এর সঠিকতা প্রমাণিত না হয়। তবে নিশ্চয় এটি ইবাদাতের নামে প্রচলিত একভ্রান্ত বিদআত যা মানুষকে জান্নাতের পথ হতে সরিয়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে (নাউযুবিল্লাহ মিন যালিক)। তাই আসুন আমরা প্রচলিত শবে মি’রাজের দিন তারিখের সত্যতা অতঃপর মি’রাজকে কেন্দ্র করে নামায, রোযা ইত্যাদি ইবাদাতের সঠিকতা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে পর্যালোচনা করি।

মি’রাজের দিন তারিখ:
পূর্বের আলোচনা হতে প্রমাণিত হয় যে, ইসরা ও মি’রাজ একটি সুপ্রসিদ্ধ ঘটনা যা কুরআন ও সহীহ হাদীসে প্রমাণিত এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু ইসরা ও মি’রাজ কোন দিন, মাস ও বছরে সংঘঠিত হয়েছে এ ব্যাপারে কুরআন ও সহীহ হাদীসের স্পষ্ট ও অস্পষ্ট কোনরূপই বক্তব্য না থাকায় বিদ্যানগণ বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন নবী (সা) এর নবুওয়াত লাভের পূর্বেই মিরাজ সংঘঠিত হয়েছে। কিন্তু ইহা বিরল তবে অধিকাংশ বিদ্যানই বলেছেন। নবুওয়াত লাভের পরেই সংঘঠিত হয়েছে এখন নবুওয়াতের কোন বর্ষে, মাসে ও দিনে সংঘঠিত হয়েছে এ নিয়ে আবার একাধিক মতামত পাওয়া যায়, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতসমূহ সংপ্তি পর্যলোচনাসহ নিম্নে আলোকপাত করা হলো ঃ
১। নবুওয়াত লাভের বছরই মি’রাজ সংঘঠিত হয়।
২। নবুওয়াত লাভের পাঁচ বছর পর মি’রাজ সংঘঠিত হয়।
৩। নবুওয়াতের দশম বছরে রজব মাসের ২৭ শে রাত্রিতে।
৪। হিজরতের এক বছর পূর্বে অর্থাৎ নবুওয়াতের ১২ তম বছরের রবিউল আওয়াল মাসের ২৭ শে রাত্রিতে।
৫। হিজরতের আট মাস পূর্বে রামাযান মাসের ২৭ শে রাত্রিতে।
৬। হিজরতের ছয় মাস পূর্বে।
৭। হিজরতের এক বছর ও দুই মাস পূর্বে মুহাররাম মাসে।
৮। হিজরতের এক বছর ও তিন মাস পূর্বে যিল হাজ্জ মাসে।
৯। হিজরতের এক বছর ও পাঁচ মাস পূর্বে শাওয়াল বা রামাযান মাসে।
১০। হিজরতের পূর্বে রজব মাসের প্রথম শুক্রবারের রাত্রে।
ইত্যাদি আরো একাধিক মতামত পাওয়া যায়। (দ্রঃ আল আইয়াদ …. (৩৫৯-৩৬০ পৃষ্ঠা) আর রাহীকুল মাখতুম – (১৩৭ পৃষ্ঠা)
সংপ্তি পর্যালোচনা ঃ উপরোক্ত মতামত সমূহ হতে ইহাই প্রমাণিত হয় যে, ইসরা ও মি’রাজ সংঘঠিত হওয়ার রাতটির তারিখ নির্ধারিত ভাবে কারো জানা নেই, কেননা এর সঠিক কোন প্রমাণ নেই।
ইমাম ইবনে কাসীর (রহ) বলেন : “যে হাদীসে বলা হয়েছে যে, ইসরা ও মি’রাজ রজব মাসের ২৭ শে রাত্রিতে সংঘটিত হয়েছে সে হাদীস সঠিক নয়। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/১০৭ পৃষ্ঠা)
ইমাম আবু শামাহ (রহ) বলেন : “অনেক আলোচক বলে থাকেন যে, ইসরা ও মি’রাজ রজব মাসে সংঘঠিত হয়েছে, মূলত : ইহা হাদীস শাস্ত্রের পন্ডিতদের কাছে এক ডাহা মিথ্যা কথা।” (আর বায়েছ ফি ইনকারিল বিদা ঃ ৭১ পৃষ্ঠা) যুগ শ্রেষ্ঠ ইমাম শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ) বলেন, মি’রাজ সংঘঠিত হওয়ার মাস ও দিন তারিখ সম্পর্কে কোন অকাট্য প্রমাণ নেই।” (যাদুল মাআদ ১/৫৭ পৃষ্ঠা)
অতএব প্রচলিত সমাজে যে মতের উপর ভিত্তি করে শবে মি’রাজ উদযাপন করা হয় সে মতটি হলো নবুয়াতের দশ বছরে রজব মাসের ২৭ শে রাত্রিতে। আমরা প্রসিদ্ধ দু’জন মুহাদ্দেস ইমামের বক্তব্য অনুযায়ী অবগত হলাম যে, উক্ত মতটি সঠিক নয় বরং মিথ্যা।
ইমামদের বক্তব্য ছাড়াও আমরা যদি বাস্তব ইতিহাসের নিরিখে প্রমাণ করতে যাই তবুও সে মতটি ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়। কারণ আমরা জানি মি’রাজের রাত্রেই পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়েছে, আর ইতিহাস প্রমাণ করে যে, হযরত খাদীজা (রা) যখন ইন্তিকাল করেন তখন পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়নি, তিনি ইন্তিকাল করলেন রামযান মাসে তখনও পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়নি, তাহলে কিভাবে সেই রামাযান মাসের দু’মাস পূর্বে রজব মাসে মি’রাজ সংঘটিত হতে পারে। সুতরাং প্রচলিত সমাজে শবে মি’রাজ উদযাপনের বা মাসটি কুরআন, সহীহ হাদীস ও বাস্তব ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী এক বানাওয়াট মিথ্যা তারিখ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। আর তারিখটিই যদি সঠিক বলে প্রমাণিত না হয় তাহলে এর উপর ভিত্তিকরে ইবাদাতে লিপ্ত হওয়া কি প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং বোকামির পরিচয় দেয়া নয়?

শবে মি’রাজের বিদ্আতী ইবাদত:
প্রচলিত সমাজে শবে মি’রাজকে কেন্দ্র করে রজব মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সালাত (নামায) সিয়াম (রোযা), মিলাদ মাহফিল রাত্রি জাগরণ, আনন্দ উৎসব, খাজা বাবার সিন্নি বিতরণ ইত্যাদি রকমারী ইবাদাতের আবিস্কার হয়েছে এবং এক শ্রেণীর দাজ্জ্বাল মিথ্যুক বহু রকমের হাদীস ও কিচ্ছা কাহিনী তৈরী করে মানুষকে বিপথে নেয়ার অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। আসুন আমরা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে এসব ইবাদাতের সত্যতা যাচাই করে দেখি।
১। সালাতুর রাগাইব:
রজব মাসকে কেন্দ্র করে যে সব বিশেষ সালাত আদায় করা হয় তন্মধ্যে অন্যতম হলো সালাতুর রাগাইব। আনাস (রা) এর বরাত দিয়ে নবী (সা) হতে বর্ণনা করে বলা হয় যে ব্যক্তি রজব মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার রোযা রেখে মাগরিব ও ইশার মাঝে দুই দুই করে বার রাকাআত নামায পড়বে প্রতি রাকাআতে সূরা ফাতেহা অতঃপর সূরা কদর তিনবার এবং সূরা ইখলাস (১২) বার, এভাবে নামায শেষে সত্তর বার দরুদ পাঠ করবে এবং বিশেষ মোনাজাত করবে তাহলে এ নামায তার কবরে এসে তাকে যাবতীয় বিপদ মুসিবত হতে উদ্ধার করবে।
ইমাম গাযালী (রহ) এর মত ব্যক্তিত্ব তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন- এ(১/২০২-২০৩) বলেন ঃ এ নামাযের নাম হলো রজবের নামায, ইহা মুস্তাহাব নামায যদিও ঈদ ও তারাবীহ এর নামাযের মত ইহা প্রমাণিত নয়, কিন্তু ফিলিস্তিনবাসীদেরকে গুরুত্ব সহকারে ইহা আদায় করতে দেখে আমি এ নামাযের উপস্থাপন করা ভাল মনে করছি।
মূলতঃ এসব ব্যক্তির এরূপ বক্তব্য ও গ্রন্থই মানুষকে বিদআতের দিকে ধাবিত করার জন্য যথেষ্ট। কারণ এ নামায সম্পর্কিত বর্ণনাগুলি সকল মুহাদ্দিসের ঐক্যমতে জাল বানাওয়াট, মিথ্যা (দ্রঃ কিতাবুল মাওযুয়াত, ২/১২৪, ১২৫ পৃষ্ঠা)
বস্তুতঃ এ সালাতুর রাগাইব সর্ব প্রথম ৪৮০ হিজরী ফিলিস্তিনে আবির্ভূত হয়। এরপূর্বে নবী (সা) সাহাবীগণ তাবেয়ীগণ এবং ৪৮০ হিজরী এর পূর্বে কোন সলফে সালেহীন উল্লিখিত সালাত আদায় করেছেন বলে কোন সঠিক প্রমাণ নেই। (দ্রঃ আল হাওয়াদেছ ওয়াল বিদা -১২২ পৃষ্ঠা)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ) বলেন ঃ সকল ইমামদের ঐক্যমতে সালাতুর রাগাইব বিদআত, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বা কোন খলীফা কেহই ইহা চালু করেননি এবং ইমাম মালেক, শাফেয়ী, আহমদ, আবু হানীফা, ছাওরী, আওযায়ী, লাইছ ইত্যাদি কেউ ইহা পছন্দ করেন নি, আর এ বিষয়ে যে হাদীস বর্ণনা করা হয় সকল মুহাদ্দীসের ঐক্যমতে তা মিথ্যা ও বানাওয়াট।” (মাজমুফাতাওয়া – ২৩/১৩৪)
২। বিশেষ রোযা পালন ঃ
শবে মি’রাজকে কেন্দ্র করে রজব মাসের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত প্রতি বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও ২৬ তারিখে ইত্যাদি বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন দিনে রোযা রাখা সম্পর্কে প্রচলিত সমাজে অনেক মিথ্যা জাল হাদীসের ছড়া ছড়ি রয়েছে, দীর্ঘ হয়ে যাবে আশঙ্কায় এখানে সে সব হাদীসের অবতারণা ভাল মনে না করে সে প্রসঙ্গে মুহাদ্দিসে কিরামদের কিছু বক্তব্য উল্লেখ করেই যথেষ্ঠ মনে করতে চাই। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) বলেন ঃ “রজব মাসের ফযীলত বর্ণনায়, সে মাসে রোযার ফযীলত বর্ণনায় বা এ মাসে কোন নির্দিষ্ট দিনে রোযা রাখা বা রাত্রি জাগরণ সম্পর্কে কোন দলীলযোগ্য সহীহ হাদীস প্রমাণিত হয়নি। (আল বিদা আল হাওলিয়া ২১৪ পৃষ্ঠা) ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ) বলেন ঃ “রজব মাসকে বিশেষ ভাবে সম্মান করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত, আর এ মাসকে রোযার মৌসুম হিসাবে মনে করা ইমাম আহমাদ (রহ) সহ সকলেই অপছন্দ করতেন।” (ইকতিযাউস সিরাত- ২/৬২৪, ৬২৫ পৃষ্ঠা)
সুতরাং রজব মাসে বিশেষ রোযা রাখার ব্যাপারে সব হাদীসই দুর্বল বরং জাল বা বানাওয়াট যা কোন মুহাদ্দিসের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। (আল বিদা আল হাওলিয়া – ২২৬ পৃষ্ঠা)
তাইতো সাহাবীদের অনেকেই এ মাসে বিশেষ রোযা রাখতে বাধা দিতেন। এমনকি আমীরুল মুমিনীন ওমার (রা) যাদেরকে রোযা রাখতে দেখতেন তাদেরকে প্রহার করতেন এবং রোযা ভেঙ্গে ফেলার জন্য খেতে বাধ্য করতেন, আর বলতেন ঃ রজব এমন মাস যাকে জাহেলী যুগের লোকেরা সম্মান করতো, বড় করে দেখতো।” (আল বিদা আল হাওলিয়া- ২৩৪ পৃষ্ঠা)
৩। শবে মেরাজের আনুষ্ঠানিকতা ঃ
তথা কথিত ২৭ শে রজবের রাত্রিটি শবে মিরাজ বা মিরাজের রজনী বলা হয়, এ জন্য যে সব আনুষ্ঠানিকতা, মাসজিদের আলোকসজ্জা ও খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হয়, যার বর্ণনা দিতে গেলে এক ছোট পুস্তিকা পূর্ণ হয়ে যাবে, তাই সে সব অনর্থক কথা বার্তার অবতারণা না করে এ সম্পর্কে বিদ্যানদের কিছু বক্তব্য তুলে ধরতে চাই।
বিংশ শতাব্দীর বিশ্ববিখ্যাত আলিমে দীন আল্লামা শায়খ ইবনে বায (রহ) বলেন ঃ “….. কোন মুসলিমের জন্য মিরাজের রজনীকে কেন্দ্র করে কোন প্রকার আনুষ্ঠানিকতায় লিপ্ত হওয়া বৈধ হবেনা। কারণ নবী (সা) ও তাঁর সাহাবায়ে কিরামগণ (রা) মিরাজের রাতকে কেন্দ্র করে কোন প্রকার আনুষ্ঠানিকতা করেননি এবং বিশেষ কোন ইবাদাতেরও প্রচলন ঘটান নি। অতএব এই আনুষ্ঠানিকতা যদি শরীয়ত সম্মত কাজ হতো তাহলে অবশ্যই নবী (সা) স্বীয় উম্মাতকে তাঁর কথা বা কাজের মাধ্যমে অবগত করাতেন এবং সাহাবাগণ তা বর্ণনা করতেন। সুতরাং ইহা এক ভ্রান্ত বিদআত, যা হতে বিরত থাকা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য কতব্য। (দ্রঃ আল বিদা ওয়াল মুহদাছাত = ৫৮৯-৫৯০)
এ হলো মিরাজের রাত্রির আনুষ্ঠানিকতার কথা, আর এ আনুষ্ঠনিকতার সাথে যা কিছু হয়ে থাকে তা বলার অপো রাখেনা, বিশেষ করে মাযার সমূহে এদিনকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় গাজার আসর, অবাধে নারী পুরুষের যৌথ ভাবে গান-তামাসার আসর, ইত্যাদি যা একজন জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি একটু চিন্তা করলেই বলবেন যে,ইহা ইসলাম গর্হিত ও নিষিদ্ধ পাপ কর্ম ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করে এ সমস্ত ভ্রান্ত কাজ হতে রেহাই দান করুণ, আমীন।

আল কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে প্রচলিত শবে মিরাজ উদযাপনের পরিণতি:
হে মুসলিম ভাই ও বোন! আল্লাহ আপনাকে রহম করুন! জেনে রাখুন প্রতিটি মুসলিম এর প্রত্যাবর্তন স্থল হলো কুরআন ও সহীহ হাদীস। এ দুয়ের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়াই হলো তার কর্তব্য এবং এ দুয়ের আলোকে যাবতীয় ইবাদাত সম্পাদন করাই হলো তার আদর্শ। তাই আসুন আমরা সংপ্তিভাবে আল কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে প্রচলিত শবে মিরাজ উদযাপনের পরিণতি জেনে নেই।
১। আল কুরআনের আলোকে:
আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে সূরা বানী ইসরাইল ও সূরা আন নাজমে ইসরা ও মিরাজের আলোচনা তুলে ধরেছেন, তাই এর প্রতি আমাদের অবশ্যই ঈমান আনতে হবে কিন্তু প্রচলিত শবে মিরাজ উদযাপনের দিন তারিখ বা আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে কুরআনের কোথাও কোনরূপ ইঙ্গিত নেই বরং আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا
“আর রাসূল তোমাদের যা দিয়েছেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে বারণ করেছেন তা হতে বিরত থাক।” (সূরা হাশর: ৭)
আমরা দেখতে পাই রাসূল (সা) এরূপ শবে মিরাজ উদযাপনের কোন আদেশ বা অনুমতি দিয়েছেন বলে এর সঠিক কোন প্রমাণ নেই। তাই ইহা রাসূল (সা) এর অনুসরণ নয় বরং তার বিরোধিতা, আর আল্লাহ তা‘আলা বলেন ঃ
فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
“তাদের সতর্ক হয়ে যাওয়া উচিত যারা তাঁর (রাসূলের) আদেশের বিরুদ্ধাচারণ করে, বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে। (সূরা নূর ঃ ৬৩)
২। সহীহ হাদীসের আলোকে:
আল্লামা শায়খ ইবনে বায (রহ) বলেন ঃ যে রাত্রে মিরাজ সংঘঠিত হয়েছে ধারণা করা হয় সে রাতটি রজব মাস অথবা অন্য কোন রাত বা মাস, মূলত নির্দিষ্ট ভাবে সহীহ হাদীসে প্রমাণিত হয়নি। বরং মিরাজের দিন তারিখ সম্পর্কে যে সব বর্ণনা পাওয়া যায় সকল মুহাদ্দিসগণ বলেন ঃ সে সব বর্ণনা নবী (সা) হতে বিশুদ্ধ ভাবে প্রমাণিত নয়। যদিও নির্দিষ্ট তারিখ প্রমাণিত হয় কিন্তু সে তারিখে বিশেষ কোন ইবাদাত করতে হবে বলে নবী (সা) ও সাহাবীদের হতে কোন প্রমাণ নেই …. তাই সবই বিদআতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত যা বর্জন করাই হলো মুসলিম ব্যক্তির কর্তব্য। (আল বিদা ওয়াল মুহদাছাত- ৫৮৯ পৃষ্ঠা)
সুতরাং শবে মিরাজকে কেন্দ্র করে বিশেষ ভাবে যে সব ইবাদাত পালন করা হয় তা কখনও আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, নবী (সা) বলেন:
من أحدث فى أمر نا هذا ماليس منه فهو رد
“যে ব্যক্তি আমাদের এই (দীনের) কাজে এমন কিছু আবিস্কার করবে যা তাতে ছিল না তা প্রত্যাখ্যান যোগ্য।” (মুসলিম শরীফ, হাদীস নং ১৭১৮) কারণ এমন সব ইবাদাত বিদআত যা ভ্রান্ত ও গুমরাহি নবী (সা) বলেন ঃ كل محدثة بدعة وكل بدعة ضلالة “প্রতিটি নব আবিস্কৃত ইবাদাতই হলো বিদআত আর প্রতিট বিদআতই হলো ভ্রান্ত পথভ্রষ্টতা (আবু দাউদ, তিরমিযী, ও ইবনে মাজাহ), অন্য বর্ণনায় এসেছে ঃ وكل ضلالة فى النار সব গুমরাহীই জাহান্নামের পথে। (নাসাঈ শরীফ) অতএব প্রচলিত শবে মিরাজ উদযাপন মানুষের হিদায়াত নয় বরং যালালাত গুমরাহী বা পথ ভ্রষ্টতা, যেহেতু তা ইসলামের ইবাদাত নয়।
উপসংহার:
উপসংহারে আমরা বলতে পারি ঃ (১) কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে ইসরা (রাত্রের ভ্রমণ বায়তুল্লাহ হতে মাসজিদ আকসা পর্যন্ত) ও মিরাজ (ঊর্ধ্ব গমন) সত্য ও বাস্তব জাগ্রত অবস্থায় স্বশরীরে নবুয়াতের পর হিজরতের পূর্বে মক্কা থাকা কালীন নবী (সা) এর মুজিজা সংঘঠিত হয়েছে, এর প্রতি সকলকে ঈমান আনতে হবে।
(২) কুরআনে, নবী (সা) এবং সাহাবীগণ হতে বিশুদ্ধ ভাবে মিরাজের নির্দিষ্ট দিন তারিখ প্রমাণিত হয়নি। তাই প্রচলিত হিজরী বছরের রজব মাসে ২৭ শে রাত্রে মিরাজ হওয়ার তারিখটি বানাওয়াট ও অসত্য। অতএব তারিখই যদি ভিত্তিহীন হয় তাহলে কিভাবে সে তারিখে বিশেষ ইবাদত ও অনুষ্ঠানাদি সঠিক হতে পারে?
(৩) তর্কের খাতিরে যদিও ধরে নেয়া হয় যে, ঐ তারিখেই মিরাজ হয়েছে। তবুও প্রচলিত শবে মিরাজ উদযাপন ও ইবাদত শরীয়ত সম্মত নয়। কারণ মিরাজের রাতকে কেন্দ্র করে নবী (সা) সাহাবীগণ, তাবেয়ীগণ, কেউ বিশেষ কোন নামায, রোযা করেছেন বা করার জন্য বলেছেন এর সঠিক কোন প্রমাণ নেই।
সুতরাং প্রচলিত শবে মিরাজকে কেন্দ্র করে সালাতুর রাগাইব, কোন রোযা, রাত্রি জাগরণ, আনুষ্ঠানিকতা, খানা পিনার আয়োজন ও সিন্নি বিতরণ সবকিছু বিদআত বা গুনাহের কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ আমাদের অজ্ঞতা ও প্রবৃত্তির পূজা বর্জন করে সঠিক জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে ইসলামের ইবাদাত করার তাওফিক দান করুণ, আমীন!

 

 

(আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী)
অধ্যক্ষ
মাদরাসাতুল হাদীস
৯৪ কাজী আলাউদ্দীন রোড
নাজির বাজার, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০১৭১৫-৩৭২১৬১

যোগাযোগ:
এডিটর ও মডারেটর:
মুহাম্মদ আবূ তালিব বিন ইসহাক
শিক্ষক-মাদরাসাতুল হাদীস
৯৪ কাজী আলাউদ্দীন রোড
নাজির বাজার, ঢাকা, বাংলাদেশ।
01726-942851
Skype: abu.talib851

আপনার নেটওর্য়াকে শেয়ার করুন

Leave a comment