“তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ: পরিচয় ও প্রয়োজনীয়তা”

আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
أَمَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَأَنزَلَ لَكُم مِّنَ السَّمَاء مَاء فَأَنبَتْنَا بِهِ حَدَائِقَ ذَاتَ بَهْجَةٍ مَّا كَانَ لَكُمْ أَن تُنبِتُوا شَجَرَهَا أَإِلَهٌ مَّعَ اللَّهِ بَلْ هُمْ قَوْمٌ يَعْدِلُونَ – أَمَّن جَعَلَ الْأَرْضَ قَرَارًا وَجَعَلَ خِلَالَهَا أَنْهَارًا وَجَعَلَ لَهَا رَوَاسِيَ وَجَعَلَ بَيْنَ الْبَحْرَيْنِ حَاجِزًا أَإِلَهٌ مَّعَ اللَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ – أَمَّن يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاء الْأَرْضِ أَإِلَهٌ مَّعَ اللَّهِ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ – أَمَّن يَهْدِيكُمْ فِي ظُلُمَاتِ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَن يُرْسِلُ الرِّيَاحَ بُشْرًا بَيْنَ يَدَيْ رَحْمَتِهِ أَإِلَهٌ مَّعَ اللَّهِ تَعَالَى اللَّهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ – أَمَّن يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَمَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاء وَالْأَرْضِ أَإِلَهٌ مَّعَ اللَّهِ قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন: বল তো কে সৃষ্টি করেছেন নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং আকাশ হতে তোমাদের জন্যে বর্ষণ করেছেন পানি। অতঃপর তদ্বারা আমি মনোরম বাগান সৃষ্টি করেছি। (বাগানতো দূরের কথা) তার বৃক্ষাদি উৎপন্ন করার শক্তিই তোমাদের নেই। অতএব আল্লাহর সাথে অন্য কোন মাবুদ বা উপাস্য আছে কি? বরং তারা আল্লাহকে বর্জন করায় সত্য বিচ্যুত সম্প্রদায়। বলতো কে পৃথিবীকে বাসোপযোগী করেছেন এবং তার মাঝে মাঝে নদ-নদী প্রবাহিত করেছেন, তাকে স্থির রাখার জন্যে পর্বত স্থাপন করেছেন এবং দুই সমুদ্রের মাঝখানে অন্তরায় সৃষ্টি করেছেন। অতএব আল্লাহর সাথে অন্য কোন মাবুদ বা উপাস্য আছে কি? বরং তাদের অধিকাংশই জানেনা। বলতো কে নিঃসহায়ের ডাকে সাড়া দেন যখন সে ডাকে এবং কষ্ট দূরীভূত করেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীতে পূর্ববর্তীদের স্থলাভিষিক্ত করেন। এতএব আল্লাহর সাথে অন্য কোন মাবুদ উপাস্য আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো। বলতো কে তোমাদেরকে জলে ও স্থলে অন্ধকারে পথ দেখান এবং যিনি স্বীয় অনুগ্রহের পূর্বে সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন? অতএব আল্লাহর সাথে অন্য কোন মাবুদ বা উপাস্য আছে কি? তারা যাকে শরীক করে আল্লাহ তা থেকে অনেক উর্ধ্বে। বলতো কে প্রথমবার সৃষ্টি করেন, অতঃপর তাকে পুনরায় সৃষ্টি করবেন এবং কে তোমাদেরকে আকাশ ও যমিন থেকে রিযীক দান করেন। অতএব আল্লাহর সাথে অন্য কোন মাবুদ বা উপাস্য আছে কি? বলুন, তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ উপস্থিত কর। (সূরা আন্ নামল: ৬০-৬৪)

আয়াতসমূহ অবতরণের পেক্ষাপট: আলোচ্য আয়াতসমূহ কোন বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অবতীর্ণ হয়েছে এমন কোন বিশুদ্ধ প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে আয়াতসমূহ সূরা আন নামল এর অন্তর্ভুক্ত। আন নামল সূরাটি মাক্কী, যা মক্কার কাফির মুশরিকদের পরিবেশেই অবতীর্ণ হয়েছে। তৎকালীন মুশরিকরা আল্লাহকে স্রষ্টা হিসাবে স্বীকার করত, কিন্তু ইবাদাত বা উপাসনার ক্ষেত্রে আল্লাহকে বাদ দিয়ে একাধিক উপাস্যের ইবাদত করত। এজন্যেই আল্লাহ তা‘আলাা আলোচ্য আয়াত সমূহে তাঁর একক স্রষ্টা ও প্রতিপালক হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন যে, সৃষ্টি ও প্রতিপালনে তিনি ছাড়া অন্য কেও যোগ্য না হলে ইবাদত বা উপাসনা পাওয়ার ক্ষেত্রেও একমাত্র তিনি ছাড়া অন্য কেউ যোগ্য নেই। এ নির্দেশনা দিয়েই আলোচ্য আয়াতসমূহ আল্লাহ অবতীর্ণ করেন।

আয়াতসমূহের আলোচ্য বিষয়: আল্লাহ তা‘আলা জিন ও ইনসানকে একমাত্র তাঁর ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেন, কিন্তু মানুষ শয়তানের চক্রান্তে পড়ে আল্লাহ তা‘আলার একক ইবাদত তথা তাওহীদ বা একত্ববাদ ভুলে গিয়ে বহুত্ববাদে লিপ্ত হয়। আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টি ও প্রতিপালনে অর্থাৎ রুবুবিয়্যাহ এর ক্ষেত্রে এক ও অদ্বিতীয় হিসাবে ইবাদত অর্থাৎ উলুহিয়্যাহ এর ক্ষেত্রেও এক ও অদ্বিতীয় হওয়ার অধিকার রাখেন। অতএব স্রষ্টা হওয়ার যোগ্য যিনি, সৃষ্টি জীবের যাবতীয় ইবাদাত বা উপাসনা পাওয়ার যোগ্য একমাত্র তিনিই হবেন। তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদের এ মূল বিষয়টিই অত্র আয়াতসমূহের আলোচ্য বিষয়।

আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসীর:
সমগ্র বিশ্বের স্রষ্টা ও পরিচালক, প্রতিপালক ও মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ তা‘আলা, অতএব সমগ্র বিশ্বের সৃষ্টি জীবের যাবতীয় ইবাদাত উপাসনা পাওয়ার একমাত্র অধিকারী মাবুদ বা উপাস্য হলেন তিনি, অন্য কেউ হতে পারেনা। এ কথাগুলিই আলোচ আয়াতসমূহে উপস্থাপিত হয়েছে। (৬০) নং আয়তে আল্লাহ তা‘আলা বলেন ঃ সমগ্র নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের একমাত্র স্রষ্টা, আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণকারী এবং ত দ্বারা উদ্ভিত ও সবুজ শ্যামল বাগিচার স্রষ্টা একমাত্র মহান আল্লাহ তা‘আলা। তিনি ছাড়া অন্যের পে এ বিশাল সৃষ্টিতো দূরের কথা সামান্য কিছু উদ্ভিত উৎপন্ন করাও সম্ভব নয়। যদি তিন ছাড়া অন্য কেউ সম না হয়ে থাকে, তাহলে কিভাবে ইবাদাত বা উপাসনার অধিকারী অন্যজন হতে পারে? অতএব আল্লাহ ছাড়া অন্য সবই উপাস্য হওয়ার অযোগ্য, একমাত্র যোগ্য হলেন আল্লাহ তা‘আলাই। সুতরাং যাবতীয় ইবাদাত শুধুমাত্র তাঁরই জন্য সম্পাদন করতে হবে- এরই নাম তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। পরবর্তী আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে পৃথিবীকে বসোপযোগী, পৃথিবীতে নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত সৃষ্টিকারী, অসহায় ব্যক্তির ডাকে সাড়াদানকারী এবং তাকে বিপদ মুক্তকরণ, জলে-স্থলে ও অন্ধকারের দিশারী, সমগ্র সৃষ্টিকে কোন নযীর ছাড়াই সৃষ্টি করা ও সকল সৃষ্টি বিনাস হয়ে যাওয়ার পর তা পুনরায় নতুন করে সৃষ্টি করা এবং গোটা বিশ্বের সৃষ্টি জীবকে জীবিকা দান করা ইত্যাদি। সকল অসাধ্যের কৃতিত্ব হল একমাত্র মহান আল্লাহ তা‘আলার। তিনি ব্যতীত অন্য কারো পে ঐ সবের সামান্যতম সম্পাদন করা সম্ভব নয়। অতএব আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন উপাস্য তুলনা হতে পারে? না কখনও হতে পারেনা। সুতরাং একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই যাবতীয় ইবাদাতের যোগ্য। কিন্তু এ বিশাল পৃথিবীতে আল্লাহর কৃতিত্বের এত নিদর্শন থাকা সত্ত্বেও নির্বোধ সমাজ কোন উপলদ্ধি করতে পারেনা, কোন উপদেশ গ্রহণ করতে পারেনা, সত্যিকার উপাস্যকে ভুলে গিয়ে অন্যের উপাসনায় লিপ্ত হয়ে শির্কে জড়িত হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “মহান আল্লাহ তাদের শরীক করা হতে বহু উর্ধ্বে।”

তাওহীদের পরিচয়:
তাওহীদ শব্দটি মুসলিম সমাজে একটি সুপরিচিত শব্দ হলেও এর সঠিক পরিচয় অনেকের কাছে অজানা। এজন্য বহু মুসলিম ব্যক্তি তাওহীদের বাণীর স্বীকৃতি দেয়া সত্ত্বেও তাওহীদ পরিপন্থী কর্মকান্ডে হাবুডুবু খাচ্ছে। আসুন আমরা তাওহীদ এর পরিচয় জেনে নেই।
তাওহীদ এর শাব্দিক অর্থ:
তাওহীদ (توحيد ) শব্দটি আরবী শব্দ, যা وحد، يوحد ক্রিয়ার মূল। আরবী ভাষায় এর অর্থ হল ঃ (جعل الشيى واحدا ) অর্থাৎ কোন কিছুকে এক করে দেয়া।” অতএব আল্লাহ তা‘আলাকে যাবতীয় শরীক হতে মুক্ত করে স্বীয় কর্তৃত্ব গুণাবলী ও অধিকার এক করার নামই হল তাওহীদ।
তাওহীদ এর পারিভাষিক অর্থ:
তাওহীদ একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ যার পারিভাষিক অর্থ দু’এক বাক্যে ফুটিয়ে তোলা কঠিন। তবে সংপ্তি কলেবরে নিম্নরূপ সংজ্ঞা বলা যেতে পারেঃ “নিম্নোল্লিখিত তিনটি বিষয় মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা, মৌখিক স্বীকৃতি প্রদান করা এবং বাস্তবে পালন করার নাম তাওহীদ।

বিষয় সমূহ:
১। সমগ্র বিশ্বের স্রষ্টা, প্রতিপালক, মালিক ও পরিচালক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, অন্য কেউ নয়।
২। সৃষ্টি জীবের যাবতীয় ইবাদাত বা উপাসনা একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্যই সম্পাদন করা এবং অন্য সকল ব্যক্তি ও বস্তুকে ইবাদাতে আল্লাহর শরীক না করা অথবা সে সবের ইবাদত বা উপাসনা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা।
৩। পবিত্র কুরআন এবং সহীহ হাদীসে আল্লাহ তা‘আলার যেসব সুন্দর নাম ও পুত পবিত্র গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে সেগুলিকে কোন অপব্যাখ্যা, বিকৃতি ও সাদৃশ্য স্থাপন ছাড়াই একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্যই খাস ভাবে সাব্যস্ত করা।” (সাবীলুল হুদা ওয়ার রাশাদ: ১২ পৃষ্ঠা)

তাওহীদ নামে ধোকা:
তাওহীদ শব্দটি মুসলিম সমাজে একটি সুপরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ শব্দ যার সঠিক পরিচয় সংপ্তিভাবে হলেও আমরা “তাওহীদের পরিচয়” শিরোনামে আলোচনা করেছি। পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসে যে তাওহীদের বর্ণনা এসেছে বা রাসূল (সা) যে তাওহীদ শিক্ষা দিয়েছেন উক্ত বর্ণনাই হলো সেই তাওহীদের বর্ণনা। কিন্তু দুঃখের বিষয় মুসলিম নামধারী বিভিন্ন দল ও মত “তাওহীদ” শব্দটি ব্যবহার করে নিজেদের বাতিল মত ও পথ প্রচার করে যাছে অতএব একজন সত্যাগ্রহী মুসলিম ব্যক্তিকে এসকল ধোকা হতে সতর্ক থাকা অতি জরুরী। নিম্নে সংপ্তিভাবে কয়েকটি দলের তাওহীদী মত তুলে ধরা হলো:
১। জাহমিয়া সম্প্রদায়ের তাওহীদ:
এ সম্প্রদায়ের নিকট তাওহীদ হল আল্লাহ তা‘আলার নাম গুণাবলী ও অস্তিত্বকে অস্বীকার করা শুধু মাত্র স্মৃতিতে আল্লাহকে মনে করাই হলো তাওহীদ।
২। চরমপন্থী সুফীবাদের তাওহীদ: এ সম্প্রদায়ের নিকট তাওহীদ হল ওয়াহদাতুল উজুদ বা একেশ্বরবাদ অর্থাৎ পৃথিবীর বুকে অস্তিত্বে যা পাওয়া যায় তা সবই আল্লাহ। আকৃতিতে জিন, ইনসান, শুকুর ও কুকুর যাই হোক না কেন ইহা মূলত: আল্লাহরই উপস্থিতি।
৩। মুতাযিলাদের তাওহীদ: এ সম্প্রদায়ের নিকট আল্লাহ তা‘আলার যাবতীয় গুণাবলীকে অস্বীকার করার নামই হল তাওহীদ। পান্তরে যে আল্লাহ তা‘আলার গুণাবলীকে স্বীকার করে সে তাদের নিকট মুশরিক।
৪। আরেক জামাত মনে করে আল্লাহ তা‘আলাকে শুধু সৃষ্টিকর্তা হিসাবে স্বীকার করার নামই তাওহীদ।
৫। আরেক জামাত মনে করে আল্লাহ তালাকে শুধু বিধানদাতা হিসাবে স্বীকার করার নামই তাওহীদ।
অতএব ইসলামের দাবীদার সকল দলই তাওহীদ এর দাওয়াত দেয় এবং তাওহীদ এর কথা বলে। কিন্তু নবী (সা) এর তাওহীদ হল কতক দলের নিকট শির্ক যেমন ঃ জাহমিয়া, মুতাযিলা ও চরমপন্থী সুফীবাদের নিকট, আবার নবী (সা) এর শির্ক হল তাদের নিকট তাওহীদ। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে নবী (সা) এর তাওহীদ মেনে চলার তাওফীক দান করুন আমীন

তাওহীদের প্রকারভেদ:
কুরআন বা হাদীসে তাওহীদ কত প্রকার ও কি কি তা গণনা করে উল্লেখ হয়নি। তবে কুরআনের আয়াতগুলিতে তাওহীদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসন্ধান করে দেখলে পাওয়া যায়। তাওহীদ তিন প্রকার। নিম্নে সংক্ষেপে প্রকার সমূহপ্রদত্ত হলঃ
১। তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ, ২। তাওহীদুল উলুহিয়্যাত ও ৩। তাওহীদুল আসমা ওয়াসসিফাত।
১। তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ (প্রতিপালনে আল্লাহর একত্ববাদ):
“সমগ্র সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা, প্রতিপালক, পরিচালক, পূর্ণ মতাশীল ও সার্বভৌমত্বের মালিক হিসেবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে স্বীকৃতি দেয়া ও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করার নাম “তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ”।” যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (الْحَمْدُ للّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ) “সমগ্র বিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য যাবতীয় প্রশংসা।” (ফাতিহা)
২। তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ (ইবাদাতে আল্লাহর একত্ববাদ:
“যাবতীয় ইবাদাতের একক অধিকারী আল্লাহ তা‘আলা ইহা বিশ্বাস করতঃ শুধু তাঁর জন্যই যাবতীয় ইবাদাত সম্পাদন করার নাম ‘তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ”। যেমন ঃ আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وما امروا الا ليعبدوا الله مخلصين له الدين حنفاء ويقيموا الصلاة ويؤتوا الزكاة وذلك دين القيمة
“তাদের শুধু এ নির্দেশই দেয়া হয়েছে যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করবে, সালাত কায়েম করবে এবং যাকাত আদায় করবে। এটাই সঠিক ধর্ম। (সূরা বাইয়িনাহ: ৫)
৩। তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত (নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদ):
পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসে আল্লাহ তা‘আলার যে সব সুন্দর নাম ও পবিত্র গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে সে গুলোর কোন বিকৃতি, অপব্যাখ্যা, সাদৃশ্য স্থাপন এবং ধরণ-গঠন জিজ্ঞাসা ছাড়াই একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য সাব্যস্ত করা এবং এর প্রতি পূর্ণ ঈমান রাখার নাম “তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত”। যেমন ঃ আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
و لله الأسماء الحسنى فادعوه بها
“আল্লাহ তা‘আলার রয়েছে সুন্দর নামসমূহ তোমরা তা দ্বারাই তাঁকে ডাক।” তিনি আরো বলেন:
الرحمن على العرش استوى
“দয়াময় আল্লাহ আরশের উপর সমুন্নত।” (ত্বহা: ৫), তিনি বলেন:
تبارك الذى بيده الملك
“তিনিই বরকতময় যাঁর হাতে সমগ্র রাজত্ব। (সূরা মূলক: ১)। ইত্যাদি।

তাওহীদের প্রয়োজনীয়তা:
তাওহীদের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম যা বলার অপো রাখেনা, সংপ্তি পরিসরে কয়েকটি দিক আলোকপাতের মাধ্যমে তাওহীদের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করা হল ঃ
১। সর্বপ্রথম ওয়াজিব তাওহীদ ঃ তাওহীদ এমন একটি বিষয় যা ছাড়া কোন ব্যক্তির ঈমান সঠিক হতে পারেনা বরং ঈমানের অপর নাম হলো তাওহীদ। যাবতীয় ইবাদাতের পূর্বে অবশ্যই তাওহীদ শিা ও পালন করা অপরিহার্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন ঃ
فاعلم انه لا اله الا الله واستغفر لذنبك
(সর্ব প্রথম) জ্ঞান অর্জন কর যে আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত সত্যিকার কোন মাবুদ নেই। অতঃপর তোমার অপরাধের মা প্রার্থনা কর।” (সূরা মুহাম্মদ)
সূতরাং প্রথম ওয়াজিব হল তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। নবী (সা) বলেন ঃ
بنى الاسلام على خمس شهادة ان لا اله الا الله
“ইসলামের ভিত্তি হল পাঁচটি স্তম্ভের উপর, তন্মধ্যে প্রথম হলো স্যা প্রদান করা যে, আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত সত্যিকার কোন মাবুদ নেই। (বুখারী) ইহাই হল তাওহীদ। এ রোকণ ছাড়া ইসলামের কোন ইবাদাতের মূল্য নেই অতএব প্রথম ওয়াজিব হল তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ।
২। বান্দার উপর আল্লাহর হক তাওহীদ: আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন কোন বিনিময় পাওয়ার জন্য নয় আর মানুষও আল্লাহকে কোন বিনিময় দেয়ার মতা রাখেনা। কিন্তু সৃষ্টি হিসাবে তার উপর স্রষ্টার হক রয়েছে সহীহ বুখারীর হাদীসে এসেছে নবী (সা) মুয়াযকে (রা) জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি জানো বান্দার উপর আল্লাহর হক কি? তিনি বললেন: আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তখন তিনি (সা) বললেন ঃ
حق الله على العباد ان يعبدوه ولايشركوبه شيئا
“বান্দার উপর আল্লাহর হক হল তারা একমাত্র তাঁর ইবাদাত করবে এবং তার সাথে কাউকে শরীক করবেনা।” অর্থাৎ তার তাওহীদ পালন করাই হল বান্দার উপর আল্লাহর হক। (সহীহ বুখারী: ১২৮)
৩। নবুওয়াতের অধিকাংশ সময় তাওহীদের দাওয়াত প্রদান: সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নাবী মুহাম্মদ (সা) নবুওয়াতের ২৩ বছরের মধ্যে ১৩ টি বছরই শুধু তাওহীদ এর ভিত্তি মজবুত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন এরপর আর তাওহীদের প্রয়োজনীয়তা বলার অপো রাখেনা।
৪। তাওহীদ ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ সম্ভব নয় ঃ মানুষ যতই ইবাদাত করুক না কেন যদি তার তাওহীদ ঠিক না থাকে, তার মাঝে শির্ক স্থান পেয়ে যায় তাহলে নবী (সা) বলেন।
من لقى الله ولا يشرك به شيئا دخل الجنة ومن لقى الله ويشرك به شيئا دخل النار
যে ব্যক্তি কোন রূপ শির্কে লিপ্ত না হয়ে তাওহীদের উপর মৃত্যু বরণ করে যে জান্নাতে যাবে, অপর পে যে শির্কে লিপ্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করে সে জাহান্নামে যাবে। (সহীহ মুসলিম হাদীস নং ৯৩)
৫। তাওহীদের বদৗলতে জাহান্নাম হতে মুক্তি: কিয়ামাতের ফায়সালার পর অপরাধী মুমিন সমাজ শান্তি ভোগের জন্য জাহান্নামে যাবে অতঃপর শাস্তি শেষে তাদের তাওহীদের বদৌলতে জাহান্নাম হতে আল্লাহ মুক্তি দিবেন। নবী (সা) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা বলবেন:
وعزتى وجلالي لأخرجن من النار من قال : لا اله الا الله
আমার ইয্যাত ও সম্মানের কসম করে বলছি! যারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলার মাধ্যমে শির্ক মুক্ত হয়ে তাওহীদের উপর রয়েছে আমি অবশ্যই তাদেরকে জাহান্নাম হতে বের করব।” সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম: ৩২৬)
এতএব তাওহীদ ছাড়া ইসলাম গ্রহণ হতে পারে না আর ইসলাম গ্রহণ ছাড়া জান্নাত পাওয়া যাবেনা, সুতরাং তাওহীদের প্রয়োজনীয়তা আর বলার আপো রাখে না, আল্লাহ তা‘আলা আমাদের তাওহীদ জানা এবং মানার তাওফীক দান করুন। আমীন।

” target=”_blank”>www.youtube.com/embed/qOCumKlnVS4″ frameborder=”0″ allowfullscreen>

(আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান, মাদানী)
অধ্যক্ষ, মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা।

প্রবন্ধিট পড়ে দয়া করে শেয়ার করুন:

আপনার নেটওর্য়াকে শেয়ার করুন

Leave a comment