~~|| ||আদ-দ্বীন আল-ইসলাম ওয়েব সাইটে আপনাকে স্বাগতম|| ||~ ~* * * “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের অগ্রে কোন কিছু প্রাধান্য দিও না, আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শুনেন ও জানেন। ” [সূরা আল হুজরাত : ১] * * * “অতঃপর তোমার রবের কসম তারা কখনও ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ফায়সালাকারী হিসাবে মেনে নেয়, অতঃপর তোমার ফায়সালার ব্যাপারেও তারা কোন রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবূল করে নিবে।” [সূরা নিসা : ৬৫] * * * “যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পর, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি প্রত্যার্পণ কর যদি তোমরা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।” [সূরা নিসা : ৫৯] * * * সাহাবী আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন : “তোমাদের মাঝে দু’টি বিষয় রেখে গেলাম যতক্ষণ সে দু’টি আঁকড়ে ধরে থাকবে কখনও পথভ্রষ্ট হবে না, আল্লাহ তা’আলার কিতাব ও আমার সুন্নাত”। [মুয়াত্তা ইমাম মালিক-হা: ১৩৯৫, হাকিম-সহীহ হা: ২৯১] * * * ||কাজ চলছে... অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন|| ||~~

কুরবানীর তাৎপর্য ও শিক্ষা (অডিও এবং ভিডিও)

by shahidullah on October ২৬, ২০১২

in অনান্য, আরবী, ঈদ, বাংলা, বিবিধ, বিবিধ

শাইখ শহীদুল্লাহ খান মাদানী

আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ – الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَالصَّابِرِينَ عَلَى مَا أَصَابَهُمْ وَالْمُقِيمِي الصَّلَاةِ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ – وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُم مِّن شَعَائِرِ اللَّهِ لَكُمْ فِيهَا خَيْرٌ فَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا صَوَافَّ فَإِذَا وَجَبَتْ جُنُوبُهَا فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ كَذَلِكَ سَخَّرْنَاهَا لَكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ.

আয়াতসমূহের সরল অনুবাদ:
আল্লাহ তাআলা বলেন: “আমি প্রত্যেক উম্মাতের জন্য কুরবানীর নিয়ম করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে। তোমাদের প্রকৃত মাবুদ মাত্র একজনই, সুতরাং তোমরা তাঁরই নিকট আত্মসমর্পণ কর। আর বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও। যাদের অন্তর আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে ভয়ে কেঁপে উঠে এবং যারা তাদের বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করে এবং যারা সালাত কায়েম করে ও আমি যা দিয়েছি তা হতে ব্যয় করে। এবং (কুরবানীর পশু) উটকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন করে দিয়েছি। এতে তোমাদের জন্যে মঙ্গল রয়েছে। সুতরাং সরিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় যবেহ করার সময় তোমরা আল্লাহর নাম স্মরণ কর। অতঃপর যখন (পশুরা) কাত হয়ে পড়ে যায় তখন তা থেকে তোমরা আহার কর এবং করাও ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্ত ও ভিক্ষাকারী অভাবগ্রস্তকে। এমনভাবে আমি এ (পশু) গুলোকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর (সূরা হাজ্জ: ৩৪-৩৬)

আয়াতসমূহ অবতরণের প্রেক্ষাপট:
আলোচ্য আয়াতসমূহ অবতরণের কোন উল্লেখযোগ্য প্রেক্ষাপট বিশুদ্ধ সূত্রে জানা যায় নি, তবে আয়াতগুলির আলোচ্য বিষয় হতে প্রতীয়মান হয় যে, কুরবানীর বিধি-বিধান ও গুরুত্ব তাৎপর্যকে কেন্দ্র করেই এ আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয়েছে।

আয়াতসমূহের আলোচ্য বিষয়:
উল্লেখিত আয়াতসমূহের ভাবার্থের দিকে লক্ষ্য করলে বলা যেতে পারে যে, আলোচ্য আয়াতসমূহ কুরবানীর বিধিবিধানের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এতে আলোচনা করা হয়েছে প্রতিটি জাতির জন্য কুরবানীর বিধান প্রবর্তনের কথা। আরো আলোচনা করা হয়েছে- কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহকে স্মরণ করা এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করা, এর সাথেই সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে বিনয়ীগণকে এবং তাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোকপাত করা হয়েছে। শেষ আয়াতটিতে কুরবানীর পশু যবেহের সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করা এবং কারা কারা এ পশুর গোশত ভক্ষণের অধিকার রাখে ইত্যাদি বিষয়াদি আলোচনা করা হয়েছে।

কুরবানীর গুরুত্ব ও তাপর্য:
কুরবানী ইসলামী শরীয়তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, এমনকি এ ইবাদাত সঠিক নিয়ম ও পদ্ধদ্ধিতে এক আল্লাহ তাআলার জন্য সম্পাদন করলে তা তাওহীদ প্রতিষ্ঠার এক অন্যতম কর্ম হিসাবে গণ্য হবে, অপরপক্ষে ইহা আল্লাহ ছাড়া গাইরুল্লাহর সন্তুষ্টি বা উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা হলে তা শির্কে আকবারে পরিণত হবে। এবং কুরবানী সম্পাদনকারী ইসলামের গন্ডি হতে বের হয়ে কাফির মুশরিক বনে যাবে। (নাউযুবিল্লাহ)। সুতরাং কুরবানীর গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে ছোট করে দেখার কোন সুযোগ নেই।
মানব জাতির শুরু হতেই এ কুরবানীর প্রচলন শুরু হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِن أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الآخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ
“আপনি তাদেরকে আদামের দুই সন্তানের সংবাদ সঠিকভাবে পাঠ করে শুনান, যখন তারা দু’জনে কুরবানী করেছিল, তখন তাদের একজনের কুরবানী গ্রহণযোগ্য হল আর অপরজনের কুরবানী গ্রহণযোগ্য হল না …।” সূরা মায়েদা: ২৭
এভাবেই আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জনের এ মহতি ইবাদাত কুরবানী যুগে যুগে সকল জাতির মাঝে বিদ্যমান ছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ
“আমি প্রত্যেক উম্মাতের জন্যে কুরবানীর নিয়ম করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে।
তোমাদের প্রকৃত মা‘বুদ মাত্র একজনই, সুতরাং তোমরা তারই নিকট আত্মসমর্পণ কর। আর বিনয়ীদের সুসংবাদ দাও।” (সূরা হাজ্জ: ৩৪) এভাবেই প্রতিটি জাতির মধ্যে কুরবানীর বিধান চলতে থাকে, পর্যায়ক্রমে শুরু হয় আবুল আম্বিয়া ইবরাহীম (আ) এর যুগ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইবরাহীম (আ) কেও একই নির্দেশ দিলেন বরং আরো কঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন করালেন, নিদের্শ দিলেন কলিজার টুকরা প্রাণ-প্রিয় সন্তান ইসমাঈলকে কুরবানী করার। কিন্তু আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জন্য আল্লাহর নির্দেশ পালনে অপেক্ষা মাত্র নির্দেশের। নির্দেশ হওয়া মাত্রই তা কার্যকর হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ – وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ – قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ – إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاء الْمُبِينُ – وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ
“দু’জনই যখন আনুগত্যে আত্মসমর্পন করলেন এবং ইবরাহীম (আ) তাকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন। তখন আমি তাঁকে ডাক দিলাম হে ইবরাহীম! স্বপ্নে দেয়া আদেশ তুমি সত্যে পরিণত করেছ, এভাবেই আমি সৎ কর্মশীলদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। অবশ্যই এটা ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি এক মহান কুরবানীর বিনিময়ে তাকে (পুত্রকে) ছাড়িয়ে নিলাম।” (সূরা সাফ্ফাত: ১০৩-১০৭)
মুসলিম জাতির দীনী পিতা ইবরাহীম (আ) মূলতঃ সন্তান কুরবানীর নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং তা বাস্তবায়নও করেছেন। তাঁদের এ পূর্ণ আনুগত্যের বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা সন্তানকে অক্ষত রেখে পশু কুরবানীতে রূপদান করলেন এবং সে বিধানই তাঁর সন্তানদের মাঝে পরবর্তীতে চালু রাখলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, সে কুরবানী আজ আল্লাহর আনুগত্যের পরিবর্তে প্রশংসা কামানো এবং গোস্ত খাওয়ার উৎসবে পরিণত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ইসলামের প্রতিটি ইবাদাতের মাঝে দু’টি বিষয় নিহিত রেখেছেন: (এক) উক্ত ইবাদাত সঠিকভাবে পালনের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জন করা। (দুই) এ ইবাদাত থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে নিজের ঈমান ইসলাম ও জীবনাদর্শকে আরো সুন্দর ও সক্রিয় করা। হে মুসলিম সমাজ! আসুন, আমরা কুরবানী ইবাদাত হতে আমাদের শিক্ষণীয় বিষয়গুলি জেনে নিই।

কুরবানীর শিক্ষা:
কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে মানুষের গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব, আরো সম্ভব এ ইবাদাত হতে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজের ঈমান ও ইসলামকে পরিশুদ্ধ করা। কুরবানীর শিক্ষা নানাবিধ- তন্মধ্যে উল্লোখযোগ্য কয়েকটি শিক্ষা নিম্নে প্রদত্ত হল:
১। তাওহীদ প্রতিষ্ঠায় কুরবানী:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
فصل لريك وانحر
“অতঃপর তোমার রবের জন্য সালাত সম্পাদন কর এবং কুরবানী কর” (কাউসার:২)। অন্যত্র বলেন:
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ
“আমি প্রত্যেক উম্মাতের জন্য কুরবানীর নিয়ম করেছি যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুম্পদ জন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে।” (আল হাজ্জ: ৩৪)
এছাড়াও এ বিষয়ে একাধিক আয়াত এসেছে যা প্রমাণ করে যে, এ কুরবানী হবে একমাত্র আল্লাহ তাআলার নামেই এবং তাঁর জন্যই। যেমন:
قُلْ إِنَّ صَلاَتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
“বলুন আমার সালাত, আমার কুরবানী এবং আমার জীবন মরণ সবকিছুই বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহ তা‘আলার জন্য, তাঁর কোন শরীক নেই।” (সূরা আনআম: ১৬২)
সুতরাং মহান আল্লাহর তাওহীদ একত্ববাদ প্রতিষ্ঠায় কুরবানী একটি উল্লেখযোগ্য ইবাদাত, কিন্তু দুঃখের বিষয় কতক নামধারী মুসলমান আল্লাহর প্রতি ঈমানের দাবীদার হওয়া সত্ত্বেও পীর, ফকির, কবর, মাযার ওরোস ইত্যাদিতে গাইরুল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ঈদুল আযহার দিনের চেয়েও শবেবরাত, শবে মিরাজ, জন্ম বার্ষিকী ও মৃত্যুবর্ষিকী……
لعن الله من ذبح لغير الله
যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী করে তার উপর আল্লাহর লা‘নত।” (সহীহ মুসলিম) আশ্চর্যের বিষয় হলো, একজন মানুষ ইবাদাতের কাজ করতে গিয়ে লানতপ্রাপ্ত হয়ে ফিরে আসে। আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে ক্রোধ অর্জন করে।
অতএব প্রতিটি মুমিন মুসিলমের কুরবানী হতে শিক্ষা গ্রহণ করে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে তাওহীদ প্রতিষ্ঠার পথ বেছে নিয়ে জান্নাতের পথে অগ্রসর হওয়া উচিত, আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন

২। রাসূল (সা) এর অনুসরণে কুরবানী:
কুরবানী ইসলামের রোকন বা কোন ফরয ইবাদাত না হলেও তা পালনে মানুষের মাঝে বেশ উৎসাহ পরিলক্ষিত হয়, এমনকি বলা যেতে পারে যে, ইসলামের অন্যতম ইবাদাত ঈমানের পরেই সবচেয়ে বড় রোকন সালাত কায়েমেও যতটুকু যতœশীল নয় তারচেয়েও বেশী উৎসাহ কুরবানী পালনে। তাইতো দেখা যায়, যারা গোটা বছর সালাতের ধারে কাছে নেই ঈদের নামাযে তাদেরই ভীড় বেশী এবং কুরবানীর বড় পশু ক্রয়ের প্রতিযোগিতা তাদের মাঝেই। মানুষ এ কুরবানী ইবাদাতটি সম্পাদনে যথেষ্ট গুরুত্বশীল, এ কুরবানী সুষ্ঠুভাবে পালনের জন্য নবী (সা) এর নির্দেশনা অনুশীলনেও সচেষ্ট, যেমন পশুটি কুরবানীর উপযুক্ত হওয়ার জন্য যে সব বৈশিষ্ট্য প্রয়োজন তা ভালভাবে লক্ষ্য করা হয়। অনুরূপ কুরবানী যবেহ করার সময় সম্পর্কেও খুব গুরুত্ব দেয়া হয়। হাদীসে এসেছে:

সাহাবী বারা (রা) বর্ণনা করেন তিনি বলেন: “আমরা আমাদের এই (ঈদুল আযহার) দিনে সর্ব প্রথম ঈদের নামায আদায় করব অতঃপর বাড়ীতে ফিরে কুরবানী করব। যে ব্যক্তি এরূপ করবে সে সুন্নাত মোতাবেক কুরবানী করল আর যে (ঈদের নামাযের) পূর্বে কুরবানী করল সে যেন শুধু পরিবারের গোশত খাওয়ার ব্যবস্থা করল, উহা তার কুরবানী বলে গণ্য হবে না: (মুসলিম: ১৫৫৩)
নাবী (সা) এর নির্দেশ মোতাবেক প্রতিটি মানুষই কুরবানীর ঈদের সালাত সম্পাদন করার পর কুরবানীর পশু যবেহ করে। কুরবানী নষ্ট হয়ে যেতে পারে এ ভয়ে কেউ ঈদের সালাতের পূর্বে কুরবানী করে না; সকলেই নবী (সা) এর বেঁধে দেয়া সময়সীমা অনুসরণে পূর্ণ সতর্কতার সাথে তা পালনে সচেষ্ট, মুসলিম সমাজের কাছে প্রশ্ন, নবী (সা) এর অনুসরণ কি শুধু কুরবানীতে সীমাবদ্ধ, না ইসলামের প্রতিটি ইবাদাতে? সকলেই একবাক্যে উত্তর দিবেন যে, নবী (সা) এর অনুসরণ ইসলামের প্রতিটি ইবাদাতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের অনুসরণ কর, আর তোমাদের আমল সমূহ বাতিল করে না (সূরা মুহাম্মদ: ৩৩)
অতএব কুরবানী আমাদের জন্য রাসূল (সা) এর অনুসরণের এক বাস্তব নমুনা, যা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ইসলামের প্রতিটি ইবাদাত তাঁর দেয়া নির্দেশ অনুযায়ী পালন করতে হবে। অন্য কোন মত ও পথ বা খেয়াল খুশী মতো করলে তা কুরবানীর মতই বাতিল ইবাদাত বলে গণ্য হবে। নবী (সা) বলেন:
من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهورد
“যে ব্যক্তি এমন কোন আমল/ইবাদাত করল যে ব্যাপারে আমাদের কোন নির্দেশনা নেই তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।” (সহীহ মুসলিম)
সুতরাং কুরবানী আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আমাদের ঈমান আমল, সালাত যাকাত, সিয়াম, কিয়াম ইত্যাদি সকল ইবাদত আল্লাহ তাআলার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হলে বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত রাসূল (সা) এর বেঁধে দেয়া সময়সীমা ও নিয়ম নীতির আলোকে সম্পাদন করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সেই হেদায়াত দান করুন। আমীন!

৩। তাকওয়া প্রতিষ্ঠায় কুরবানী:
যে সব উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কুরবানীর প্রবর্তন হয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হলো তাকওয়া প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন ঃ
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ
আল্লাহর কাছে পৌঁছে না ওসবের (কুরবানীর) গোশত ও রক্ত বরং তার কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া: (সূরা হাজ্জ: ৩৭)
জাহেলী যুগের নির্বোধ সমাজ কুরবানী করার পর কেউ তাদের প্রতিমার গায়ে রক্ত মাংস মেখে দিত, আবার কেও কা‘বা গৃহের দেয়ালে কুরবানীর রক্ত মেখে দিত। (ইবনে কাসির ৩/২৪৭) কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা সে রক্ত মাংস চান না,বরং তিনি চান আমাদের তাকওয়া আল্লাহ ভীতি ও সংযমতা, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, আজ আমরা কুরবানীর মাধ্যমে তাকওয়া প্রদর্শনের চেয়ে বাহ্যিক চাকচিক্য ও রক্ত গোশত প্রদর্শনই মুখ্য উদ্দেশ্য মনে করছি। অবশ্য কুরবানীর পশু সুন্দর ও আকর্ষণীয় হওয়ার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে, ইহা মূলতঃ মানুষের হীন ভাবকে দূর করার জন্যই, কারণ কুরবানীর পশুর ক্ষেত্রে ঐসব গুণাবলী সম্পন্ন হওয়া শর্ত করা না হলে সদকা বা মানতের ছাগলের মতই এর অবস্থা হতো। যত রকমের ছোট কম মূল্যের প্রাণীই বেশী সংখ্যক মানুষ কুরবানীর জন্য নির্ধারণ করত। অতএব ঐসব শর্ত থাকা মানে বাহ্যিক চাকচিক্য উদ্দেশ্য নয়, বরং মূল উদ্দেশ্য হল অন্তরের তাকওয়া। এজন্যই আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ
আল্লাহ তা‘আলা শুধুমাত্র সংযমশীল তাকওয়াবানদের থেকেই (কুরবানী) কবুল করেন। (সূরা আল মায়েদাহ: ২৭)
অতএব কুরবানী আমাদেরকে তাকওয়ার শিক্ষাই দিয়ে যাচ্ছে। আসুন আমরা মুত্তাকি হওয়ার চেষ্টা করি।

৪। আত্মত্যাগে কুরবানী:
মানুষ পার্থিব মোহে মোহিত হয়ে ছুটছে প্রাচুর্য ও আধিক্যতার টানে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন ঃ أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে। (সূরা তাকাসুর: ১)
মানুষের জানমাল খুবই মূল্যবান, এসবের ত্যাগস্বীকার করা যেন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে হয় পার্থিব জীবনই আমাদের শেষ ঠিকানা, তাই কীভাবে এ ভবের সংসার গড়া যায় সে প্রতিযোগিতাই সারাক্ষণে। কিন্তু না, না, তা না, ঐ দীর্ঘ দিনের পালিত মায়াময় পশুটি অথবা কষ্টার্জিত অর্থে খরিদ করা আকর্ষণীয় পশুটিকে যখন স্বহস্তে ধারল ছুরি দিয়ে পাষাণ হৃদয়ে “বিসমিল্লাহ আল্লাহু আকবার” বলে যবেহ করি, আর পশুটি মাটিতে হাত-পা চাপড়াতে চাপড়াতে নি®প্রাণ হয়ে যায় এ চাক্ষুষ দৃশ্য বলে দিচ্ছে যে শুধু পশুটি নয় বরং এ পৃথিবীর সবকিছুই নশ্বর। আল্লাহ বলেন:
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُونَ
“জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে, অতঃপর তোমরা আমারই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।” (সূরা আনকাবুত: ৫৭)
তাইতো আমাদের দীনী পিতা ইবরাহীম (আ) আল্লাহর নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথেই আত্মত্যাগ শুধু নয় বরং সর্বস্ব ত্যাগে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। আল্লাহ বলেন ঃ
فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ – وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ – قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ
ইবরাহীম ও ইসমাঈল) দু’জনই যখন আনুগত্যে আত্মসমর্পণ করলেন এবং ইবরাহীম (আ) তাকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন, তখন আমি তাঁকে ডাক দিলাম, হে ইবরাহীম! স্বপ্নে দেয়া আদেশ তুমি সত্যে পরিণত করেছ।” (সূরা ১০৩-১০৫)
আমাদের ঈদের কুরবানী সেখান থেকেই এসেছে, এ কুরবানী সে আত্মত্যাগের কথাই শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে, আসুন আমরা আল্লাহর নির্দেশ পালনে দীনের স্বার্থে আত্মত্যাগে সচেষ্ট হই।
৫। প্রতিবেশী ও দরিদ্রের অধিকার প্রদানে কুরবানী:
মানুষ সামাজিক জীব। একাকী জীবনযাপন করতে পারেনা, বরং অপরের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়, কিন্তু কোন ব্যক্তি যখন স্বচ্ছল হয় তখন অপরকে ভুলে যায়, নিজের সুখ শান্তি নিয়েই ব্যস্ত থাকে, অপরের দুঃখ, দুর্দশার কথা ভুলে যায়, কিন্তু ইসলাম এক আদর্শ জীবন বিধান, ‘চাচা আপন জান বাঁচা’ পদ্ধতিকে কখনও সমর্থন করে না, বরং পরোপকারকেই বড় করে দেখেছে, এমনকি প্রতিবেশীর অধিকার প্রদানকে ঈমানের এক বড় অংশ বানিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ
“পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ কর এবং আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-দরিদ্র, নিকটতম ও দূরবর্তী প্রতিবেশী এবং পথিক ও অধীনস্থ দাস-দাসীর প্রতি সদাচরণ কর। (সূরা নিসা: ৩৬)
রাসূল (সা) বলেন: “জিবরাইল (আ) আমাকে সর্বদায় প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণের উপদেশ দেন, এমনকি আমার মনে হয় তিনি যেন প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ বানিয়ে ফেলবেন। বুখারী হাদীস: ৬০১৪, মুসলিম হাদীস নং ঃ ২৬২৪)
নাবী (সা) আরও বলেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে সে যেন স্বীয় প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করে এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে সে যেন স্বীয় আত্মীয় স্বজনের প্রতি সম্মান দেখায়। (বুখারী ও মুসলিম- মিশকাত)
অতএব প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনের অধিকার প্রদান ঈমানের এক বৃহৎ অংশ হওয়া সত্ত্বেও মানুষ তা প্রদানে খুবই কৃপণ, কিন্তু কুরবানী আমাদের সেই মহান দায়িত্ব পালনের কথাই শিক্ষা দিয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন ঃ
فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ
“তোমরা উহা (কুরবানীর গোশত) হতে খাও এবং সংযমী দরিদ্র ও ভিক্ষাকারী অভাবীকে খাওয়াও।” (সূরা হাজ্জ: ৩৭)
নবী (সা) বলেন: “তোমরা খাও সঞ্চয় করে রাখ এবং দান কর।” (সহীহ বুখারী হাদীস নং ৫৫৭০, সহীহ মুসলিম: ১৯৭১) গরীব মিসকিনদেরকে খাওয়াবে। সুতরাং কুরবানী আমাদেরকে প্রতিবেশী ও দরিদ্রের অধিকার প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দান করে, আল্লাহ আমাদের সর্বদায় প্রতিবেশী ও দরিদ্রের যথাযথ অধিকার প্রদানে সচেষ্ট হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন
পরিশেষে আমরা বলতে পারি কুরবানী এমন একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদাত যার মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার সাথে সাথে তাঁর তাওহীদ প্রতিষ্ঠা, সুন্নাতে রাসূলের একচ্ছত্র অনুসরণ এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ইসলামী অনুশীলনের বাস্তব শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। আল্লাহ আমাদের কুরবানী পালনের মাধ্যমে পূর্ণ সফলতা অর্জন করার তাওফীক দান করুন। আমীন!

লেখক:
(শাইখ আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ খান মাদানী)
অধ্যক্ষ – মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা-১০০০।
ও আলোচক- পিস.টিভি বাংলা।
মোবাইল: ০১৭১৫-৩৭২১৬১

(অত্র ওয়েবসাইটের এডিটর)
(আবু তালিব বিন ইসহাক)
শিক্ষক – মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা-১০০০।
মোবাইল: ০১৭২৬-৯৪২৮৫১
স্কাইপ: abu.talib851

আপনার নেটওর্য়াকে শেয়ার করুন

{ 0 comments… add one now }